ভ্রমণকাহিনি · Travel memoir

উশুয়াইয়া: পৃথিবীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে

বিগল চ্যানেলের তীরে উশুয়াইয়া শহর
← সব লেখা

বাংলা কণ্ঠে শুনতে বোতামটি চাপুন।

আমি পৃথিবীর অনেক শহর দেখার সুযোগ পেয়েছি, তবে সব শহর মনে একইভাবে দাগ কাটেনি। কিছু শহর দেখার পর অনেক দিন মনে দাগ কেটে থাকে; আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া তেমনই একটি শহর। এই শহরটি আমার মনে গভীর ছাপ ফেলেছে।

উশুয়াইয়াকে পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষিণের শহর বলা হয়। এই কারণে একে বলা হয় “Fin del Mundo”, যার অর্থ পৃথিবীর শেষ প্রান্ত। নামটি শুনতে রোমাঞ্চকর মনে হলেও এখানে এলে বোঝা যায় জায়গাটি সত্যিই কতটা আলাদা। চারদিকে পাহাড়, প্রচণ্ড বাতাস আর বিশাল বিগল চ্যানেল—সব মিলিয়ে মনে হয় আমরা সত্যিই পৃথিবীর একেবারে শেষ সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছি।

অক্ষাংশের হিসাবে উশুয়াইয়া ৫৪.৮° দক্ষিণে—আফ্রিকার কেপ আগুলহাস ও নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড আইল্যান্ডসের দক্ষিণ প্রান্তেরও অনেক বেশি দক্ষিণে। বাংলাদেশের দক্ষিণতম বিন্দু সেন্ট মার্টিন দ্বীপ যেখানে ২০.৬° উত্তরে, সেখানে উশুয়াইয়া বিষুবরেখা থেকে বহুদূরে দক্ষিণে।

এক অনন্য শহর

উশুয়াইয়ার জনসংখ্যা প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ হাজার। এখানকার আবহাওয়া খুব ঠান্ডা এবং প্রচণ্ড বাতাস। গ্রীষ্মকালেও তাপমাত্রা সাধারণত ১০–১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে; সারা বছরই প্রবল বাতাস, হালকা বৃষ্টি বা তুষারপাতের দেখা মেলে। হাজার হাজার বছর আগে ইয়ামানা বা ইয়াগান নামে যাযাবর আদিবাসী জনগোষ্ঠী এখানে বাস করত। পরে কারাগার নির্মাণের কারণে উশুয়াইয়াকে একসময় “আর্জেন্টিনার আলকাতরাজ” বলা হতো।

আমাদের জাহাজ যখন উশুয়াইয়া বন্দরের কাছে পৌঁছায়, তখন ভোর পাঁচটা। ক্যাপ্টেনের ঘোষণা শুনেই আমি ১৪ তলার অবজারভেশন ডেকে চলে যাই। কাচের ভেতর দিয়ে দেখা প্রথম দৃশ্যটি ছিল অবিস্মরণীয়—একদিকে তুষারাবৃত আন্দিজ পর্বতমালা, অন্যদিকে বিগল চ্যানেলের গাঢ় নীল জলরাশি। মাঝখানে ছোট উশুয়াইয়া শহরটি যেন প্রকৃতির বিশালতার কাছে একবিন্দু বসতি।

বিগল চ্যানেলে নৌভ্রমণ

উশুয়াইয়া আসার আগে ঠিক করেছিলাম বিগল চ্যানেলে নৌভ্রমণ করব। জাহাজ থেকে নেমেই বন্দরের পাশের একটি বুথ থেকে ছয় ঘণ্টার বোট রাইডের টিকিট কাটি। সকাল নয়টায় যাত্রা শুরু হয়। কিছুদূর যাওয়ার পরই চোখে পড়ল ঐতিহাসিক লেস এসক্লেয়েরাস বাতিঘর। ১৯২০ সালে নির্মিত এই বাতিঘরটি আজও বিগল চ্যানেলের একটি পাথুরে দ্বীপে নিঃসঙ্গ প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে।

হাড়কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস আর ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মধ্যেই বোটের ছাদে গিয়ে দাঁড়ালাম। ছোট ছোট দ্বীপে অসংখ্য পেঙ্গুইন আর সিল মাছের খুনসুটি দেখলাম। তবে ফেরার পথ সহজ ছিল না—বাতাসের বেগ বেড়ে যাওয়ায় বোট প্রবলভাবে দুলতে শুরু করল, আর সমুদ্রের এই রুদ্ররূপের কাছে মানুষ কত অসহায়, তা আবার অনুভব করলাম।

শহরের স্বাদ ও স্মৃতি

সময়ের অভাবে উশুয়াইয়া জাতীয় উদ্যানে যেতে না পারলেও শহরের বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে দেখলাম। স্থানীয়দের পরামর্শে একটি বিখ্যাত রেস্তোরাঁয় খেয়েছিলাম এখানকার সুপরিচিত কিং ক্র্যাব। অনেক জায়গায় ক্র্যাব খেয়েছি, তবে এখানকার স্বাদ সত্যিই অতুলনীয়।

শহরের কেন্দ্রের আশপাশে ঘোরার সময় এক বৃদ্ধা নারী একটি মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে হাতে থাকা ক্যামেরা এগিয়ে দিয়ে বললেন, “আমার একটি ছবি তুলে দিন।” আমি তাঁর ছবি তুলে দিলাম, আর বিনিময়ে তিনিও আমার একটি ছবি তুলে দিলেন। ছবিটির পেছনে ছিল আর্জেন্টিনার দুই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, জেনারেল হুয়ান ডোমিঙ্গো পেরোন ও ইভা “এভিটা” পেরোনের স্মৃতি।

এবারের ভ্রমণে অ্যান্টার্কটিকায় যাওয়া না হলেও উশুয়াইয়ার এই বন্দর শহরে দাঁড়িয়ে অজানার ছোঁয়া কিছুটা হলেও অনুভব করেছি। নীল বিগল চ্যানেলের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে, আমাদের চেনা রঙিন দুনিয়ার আড়ালে এক নীরব ও আদিম পৃথিবী এখনও আছে। উশুয়াইয়ায় এসে স্পষ্ট বুঝেছি—মানুষ প্রকৃতির চেয়ে বড় নয়, বরং তারই একটি ছোট অংশ। পৃথিবীর শেষ প্রান্তে এসে তাই মনে হয়েছে, আসলে শেষ বলে কিছু নেই; এখান থেকেই নতুন করে দেখার শুরু।