ভাবনা · Reflection

পথটা নিজেরই বেছে নিতে হয়

একটি পুরোনো পাথরের ফটক ও সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ
← সব লেখা

বাংলা কণ্ঠে শুনতে বোতামটি চাপুন।

জীবনের এতটা পথ পেরিয়ে যখন একটু থেমে পেছনে তাকাই, তখন মনে হয়—জীবন আসলে আমাদের নেওয়া অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের গল্প। একের পর এক সেই সিদ্ধান্তগুলো মনে করলে জীবনের পুরো পথটাই চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

জীবনের পথে আমরা অনেক বাঁকের মুখোমুখি হই। কখনো ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিই, কখনো পরিস্থিতির চাপে, আবার কখনো সামনে কী আছে তা না জেনেই। কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের সামনে এগিয়ে দেয়, কোনোটি হয়তো কিছুটা পিছিয়ে দেয়। কোনো সিদ্ধান্তের ফল সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি, আবার কোনোটি ঠিক ছিল কি না, তা বুঝতে অনেক বছর লেগে যায়।

জীবনের পথ সবসময় সোজা নয়। কোথাও রাস্তা প্রশস্ত, কোথাও সরু। কোথাও অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়, আবার কোথাও সামনে কয়েক কদমের বেশি কিছুই পরিষ্কার থাকে না। তবুও চলতে হয়। কারণ সব উত্তর জেনে তারপর জীবন শুরু করা যায় না। অনেক সময় যতটুকু জানা যায়, যতটুকু বোঝা যায়, তার ওপর ভরসা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

আজ এই বয়সে এসে নিজের পথচলার দিকে তাকালে মনে হয়, আমার নেওয়া সব সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। বরং কিছু ভুল সিদ্ধান্ত আমাকে বেশ পিছিয়েও দিয়েছে। কিন্তু এখন আর মনে হয় না যে ভুল সিদ্ধান্তই জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। ভুল তো জীবনেরই অংশ। আসল ব্যর্থতা তখনই হতো যদি ভুল বুঝতে পেরেও সেখান থেকে কিছু না শিখতাম, অথবা ভুলের কারণে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলতাম, কিন্তু সেটা আমার হয় নাই।

একথা ঠিক, আমার জীবনের কিছু ভুল আমাকে পিছিয়ে দিয়েছে। আবার এটাও ঠিক, সেই ভুলগুলোর কিছু আমাকে নতুন পথও দেখিয়েছে। এমনও হয়েছে, যে পথটিকে তখন ভুল মনে হয়েছিল, পরে ফিরে তাকিয়ে দেখেছি—সেই পথ না নিলে হয়তো জীবনের এই জায়গায় আমি পৌঁছাতাম না, কিংবা পৌঁছাতে পারতাম না।

সব সিদ্ধান্ত নিজের হয় না

জীবনের শুরুতে আমরা খুব কম সিদ্ধান্তই নিজেরা নিতে পারি। পরিবার, শিক্ষক, সমাজ এবং চারপাশের পরিবেশ আমাদের হয়ে অনেক সিদ্ধান্ত নেয়। কোন স্কুলে পড়ব, কী পড়ব, কোন বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেব—এসবের অনেকটাই নির্ভর করে পরিবারের প্রত্যাশা, শিক্ষকদের প্রভাব এবং আমাদের চারপাশের পরিবেশের ওপর।

আমার নিজের জীবনও তার ব্যতিক্রম নয়।

হাই স্কুলে আমার অংকের শিক্ষক ছিলেন আমার নানা। তাঁর কাছে অংক যেন শুধু একটি বিষয় ছিল না; অংকই ছিল ভালো করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ। প্রায়ই বলতেন, “অংক ভালো করে পড়ো, অংককে ভালোবাসো—অংক ছাড়া দুনিয়া অচল।”

কথাগুলো এতবার শুনেছি যে একসময় সেগুলো আর শুধু নানার কথা মনে হয়নি; নিজের বিশ্বাস বলেই মনে হয়েছে। ফলে অংক ছাড়া অন্য কোনো পথ তখন আমি প্রায় চিন্তাই করতে পারিনি।

উচ্চ মাধ্যমিকে আমার অনেক বন্ধু অংকের পাশাপাশি জীববিজ্ঞানও পড়েছিল। পরে তাদের কেউ কেউ মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু আমি জীববিজ্ঞান চতুর্থ বিষয় হিসেবেও নিইনি। ফলে মেডিকেল কলেজে আবেদন করার সুযোগও আমার ছিল না।

আজ এত বছর পর পেছনে তাকিয়ে বুঝতে পারি, তখনকার সেই সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি আমার নিজের ছিল না। পরিবার, শিক্ষক এবং চারপাশের পরিবেশ আমার চিন্তা ও পছন্দকে অনেকটাই তৈরি করে দিয়েছিল। তখন আমি যেভাবে দেখেছি, যেভাবে আমাকে বোঝানো হয়েছিল, সেভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

তবে জীবন শেষ পর্যন্ত আমাকে অন্য পথে নিয়ে গেছে—আমি ইঞ্জিনিয়ার হয়েছি।

প্রথম নিজের নেওয়া বড় সিদ্ধান্ত

ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রথম বর্ষ শেষ করার পর দ্বিতীয় বর্ষে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল—কোন শাখার ইঞ্জিনিয়ার হব: সিভিল, মেকানিক্যাল, না ইলেকট্রিক্যাল।

সময়টা ছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পর। বাংলাদেশে তখন অনেক নির্মাণকাজ চলছিল এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদাও ভালো ছিল।

তখন আমি নিজেকে খুব বেশি প্রশ্ন করিনি—আমি আসলে কী করতে চাই? কোন কাজ আমার ভালো লাগবে? কোন কাজ দীর্ঘদিন করতে পারব?

আমার চিন্তা ছিল অনেকটা বাস্তবমুখী—কোন শাখায় চাকরির সুযোগ বেশি? সেই হিসাবেই আমি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বেছে নিয়েছিলাম।

আজ মনে হয়, তখন নিজের পছন্দ, আগ্রহ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও কিছুটা চিন্তা করা উচিত ছিল। কিন্তু সেই সময় আমার যে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা ছিল, তার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

আসলে আমরা যখন এমন কোনো বড় সিদ্ধান্ত নিই, যা আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনকে প্রভাবিত করবে, তখন খুব দূরের ভবিষ্যৎ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। ভবিষ্যৎ তখন আমাদের সামনে খোলা থাকে না। আমরা দেখতে পাই শুধু বর্তমান পরিস্থিতি। সঙ্গে থাকে আমাদের সীমিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং কিছু অনুমান।

সেই সীমিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই অনেক সময় জীবনের বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

তাই পরে কোনো সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হলে শুধু ফলাফলের দিকে তাকিয়ে নিজেকে বিচার করা ঠিক নয়। দেখতে হবে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমার সামনে কী তথ্য ছিল, কী সুযোগ ছিল এবং তখন আমি কী জানতাম।

যে ভুলটি আমাকে সবচেয়ে বেশি শিখিয়েছে

ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পর জীবনের সামনে কয়েকটি পথ খোলা ছিল—শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, বেসরকারি চাকরি কিংবা বিদেশে যাওয়া।

আজ মনে হয়, সেটি ছিল আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময়। আমার উচিত ছিল একটু সময় নিয়ে চিন্তা করা, বড়দের সঙ্গে আলোচনা করা এবং যারা এই পথে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিলেন, তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া।

কিন্তু আমি তা করিনি। নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস ছিল। মনে হয়েছিল, সময় হলে সবকিছু নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে।

ফল হলো, কর্মজীবনের প্রথম পাঁচ বছরে আমি ছয়টি চাকরি বদলালাম।

কুয়েট ও রুয়েটে যোগ দিয়েছিলাম। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ এবং শেষে বেশ কয়েক বছর বিমানবন্দর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে চাকরি করেছি।

পাঁচ বছর পর একদিন হঠাৎ মনে হলো—আমি আসলে কোথায় যাচ্ছি?

একটার পর একটা চাকরি বদলেছি, কিন্তু নিজের জন্য কোনো স্থির পথ তৈরি করতে পারিনি। আমার অনেক ব্যাচমেট তখন নিজেদের জায়গা তৈরি করে ফেলেছে। কেউ এগিয়ে গেছে, কেউ স্থির হয়েছে। আর আমি যেন এখনও পথ খুঁজছি।

কিছুটা হতাশা আসতে শুরু করল। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে ফিরে গেলে জুনিয়র হয়ে আবার শুরু থেকে শুরু করতে হবে। শিক্ষকতায় গেলেও লেকচারার থেকে শুরু করতে হবে, অথচ আমার অনেক ব্যাচমেট তখন সহকারী অধ্যাপক হয়ে গেছে।

তখন মনে হলো, হয়তো বিদেশে যাওয়াই ভালো হবে।

অচেনা পথে যাত্রা

বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্তও খুব সহজ ছিল না। একটি চাকরির সুযোগ পেলাম সৌদি আরবে। অফারটি খুব ভালো ছিল না। ততদিনে বিয়ে করেছি, দুই সন্তানের বাবা। চাকরির শর্ত অনুযায়ী পরিবারকে সঙ্গে নেওয়ার সুযোগও ছিল না।

তারপরও চলে গেলাম।

পরিবারকে শ্বশুরবাড়িতে রেখে আমি একাই সৌদি আরব গেলাম। সেখানে গিয়ে বুঝলাম, সিদ্ধান্তটি হয়তো ঠিক হয়নি। চাকরিটি ছিল প্রজেক্টভিত্তিক। প্রজেক্ট শেষ হলে দেশে ফিরে যেতে হবে।

তখন মনে হয়েছিল—আবার কি ভুল করলাম?

কিন্তু এবার একটি বিষয় আগের চেয়ে ভালো বুঝেছিলাম—ভুল হয়েছে বুঝতে পারা আর হাল ছেড়ে দেওয়া এক কথা নয়।

দেশে ফিরে যাওয়ার পথ খোলা ছিল। কিন্তু আমি ভাবলাম, আরেকবার চেষ্টা না করে ফিরে যাব না।

আমার বয়সী প্রায় ৫০ জন বিভিন্ন দেশের ইঞ্জিনিয়ার সেই প্রজেক্টে কাজ করছিলেন। আমাদের মধ্যে বাংলাদেশি, ভারতীয়, পাকিস্তানি এবং ফিলিপিনো ইঞ্জিনিয়ারও ছিলেন।

প্রজেক্ট শেষের দিকে কোম্পানি সবাইকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে শুরু করল। প্রতি সপ্তাহে দু-চারজন করে আমাদের রিয়াদে ডেকে আনা হতো। কয়েক দিন রেখে হিসাব-নিকাশ শেষ করে তাঁদের যার যার দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হতো।

একসময় আমার পালাও এলো। আমি রিয়াদে এলাম। কয়েক দিন অপেক্ষা করতে করতে মনে হচ্ছিল, হয়তো এবার সত্যিই সব শেষ। দেশে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

কিন্তু তখন মনে হলো—একবার চেষ্টা না করেই ফিরে গেলে পরে নিজেকেই প্রশ্ন করব, “আর একটু চেষ্টা করলে কি কিছু করা যেত?”

সেই প্রশ্নের উত্তর না জানা অবস্থায় দেশে ফিরতে চাইনি।

অনেকটা নিজের উদ্যোগেই একা এগিয়ে গেলাম। কোম্পানির প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করলাম এবং আমার পরিস্থিতি তাঁকে ব্যাখ্যা করলাম।

শেষ পর্যন্ত একটি সুযোগ তৈরি হলো। আমাকে অন্য একটি কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো। একমাত্র আমাকেই এই সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। বাকিদের সবাইকে যার যার দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

আমি নতুন চাকরি নিয়ে সৌদি আরবেই থেকে গেলাম। পরবর্তী চার বছর পরিবার নিয়ে রিয়াদে কাটালাম।

তারপর জীবনের আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে উত্তর আমেরিকায় চলে এলাম।

আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই সময় যদি পরিস্থিতির কাছে হেরে গিয়ে দেশে ফিরে আসতাম, তাহলে আমার জীবনের পরবর্তী অধ্যায় হয়তো সম্পূর্ণ অন্যরকম হতো।

জীবনের শিক্ষা সবসময় সাফল্য থেকে আসে না

আমরা সাধারণত সাফল্যকে শিক্ষক হিসেবে দেখি। কিন্তু আমার জীবনে ব্যর্থতাও কম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক নয়।

সাফল্য আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। আর ব্যর্থতা আমাকে নিজের দিকে তাকাতে শিখিয়েছে।

কোথায় ভুল করেছি? কেন করেছি? পরেরবার কীভাবে ভিন্নভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই হয়তো ধীরে ধীরে আমি পরিণত হয়েছি।

আজ মনে হয়, আমার জীবনের কিছু ভুল সিদ্ধান্ত যদি না আসত, তাহলে হয়তো আজকের আমি তৈরি হতাম না। কিছু ভুল আমাকে ধৈর্য শিখিয়েছে। কিছু ভুল আমাকে বাস্তবতা বুঝিয়েছে। আর কিছু ভুল আমাকে শিখিয়েছে—শুধু আত্মবিশ্বাস যথেষ্ট নয়; সঠিক সময়ে সঠিক মানুষের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি।

সব পথ একসঙ্গে হাঁটা যায় না

জীবনে সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি হলো—একটি পথ বেছে নিয়ে অন্য পথগুলো ছেড়ে দেওয়া।

একটি চাকরি বেছে নিলে অন্য চাকরির সম্ভাবনা ছেড়ে দিতে হয়। একটি দেশে চলে গেলে অন্য দেশের জীবন থেকে দূরে সরে যেতে হয়। একটি সিদ্ধান্ত নিলে অসংখ্য সম্ভাবনার মধ্য থেকে একটি পথ বেছে নিতে হয়।

এখন বুঝি, জীবনে একটি পথ বেছে নেওয়া মানেই শুধু কিছু পাওয়া নয়, অনেক কিছু ছেড়ে দেওয়াও।

তখন এসব এত গভীরভাবে বুঝিনি। আজ পেছনে তাকিয়ে বুঝি—প্রতিটি সিদ্ধান্তই কিছু পাওয়া আর কিছু ছেড়ে দেওয়ার গল্প।

তারপরও সব হিসাব করেও ভবিষ্যৎ পুরোপুরি জানা যায় না। তাই জীবনে কিছু অনুশোচনা থাকবেই।

প্রশ্ন হলো—অনুশোচনা নিয়ে কতদিন বসে থাকব?

পথ বদলানো মানে পরাজয় নয়

একসময় মনে করতাম, একবার কোনো পথে গেলে সেই পথেই শেষ পর্যন্ত থাকতে হবে। এখন আর তা মনে করি না।

ভুল পথে চলে গেলে ফিরে আসা যায়। পথ কঠিন হলে পথ বদলানো যায়। কোনো সিদ্ধান্ত কাজ না করলে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

আমার নিজের জীবনই তার উদাহরণ। দেশে চাকরি করেছি, চাকরি বদলেছি, বিদেশে গিয়েছি, আবার পথ পরিবর্তন করেছি এবং শেষ পর্যন্ত আমেরিকায় এসে দীর্ঘ কর্মজীবন কাটিয়েছি।

প্রতিটি পর্যায়ে মনে হয়েছে—এই বুঝি শেষ সিদ্ধান্ত। পরে বুঝেছি, জীবনে কোনো একটি সিদ্ধান্তই শেষ সিদ্ধান্ত নয়। জীবন চলতেই থাকে।

এই জায়গাতেই রবীন্দ্রনাথের “একলা চলো রে” আমার কাছে নতুন অর্থ পায়—

“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে
তবে একলা চলো রে।”

আমার কাছে এই কথাটি শুধু একা হয়ে যাওয়ার কথা নয়। জীবনের কোনো কোনো মুহূর্তে নিজের সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়—এই সাহসের কথাও বলে।

আবার নজরুলের ‘পথিক’-এর ভাবনাটিও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ যেন বলেন—সঙ্গী না থাকলেও চলতে হবে। আর নজরুলের পথিক যেন মনে করিয়ে দেয়—পথ অচেনা হলেও চলতে হবে।

আমার জীবনের দিকে তাকালে মনে হয়, এই দুটো কথাই আমার পথচলার সঙ্গে অনেকটা মিলে যায়। কখনো একা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, কখনো অচেনা পথে পা বাড়াতে হয়েছে। সব সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল না। কিন্তু প্রতিটি সিদ্ধান্তই আমাকে কিছু না কিছু শিখিয়েছে।

পেছনে ফিরে তাকালে

অবসর জীবনে এসে এখন যখন নিজের পথচলার দিকে তাকাই, তখন সাফল্যের চেয়ে ভুলগুলোই অনেক সময় বেশি মনে পড়ে।

কোথায় কি অন্যভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম? কোথায় কি আরও ধৈর্য ধরতে পারতাম? কোথায় বড়দের পরামর্শ নেওয়া উচিত ছিল এবং নিলে কি হতো? কোথায় নিজের ওপর অতিরিক্ত বিশ্বাস করেছিলাম?

এই প্রশ্নগুলোর সব উত্তর হয়তো কখনো পাওয়া যাবে না। কিন্তু এখন মনে হয়, জীবনের হিসাব শুধু সঠিক সিদ্ধান্ত আর ভুল সিদ্ধান্ত দিয়ে করা যায় না। আরও একটি বিষয় দেখতে হয়—ভুল করার পর আমি কী করেছি? আমি কি থেমে গিয়েছিলাম? নাকি আবার উঠে দাঁড়িয়েছিলাম?

আমার মনে হয়, জীবনের আসল পরীক্ষা এখানেই। আজ আর আমার অতীতের ভুল সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে খুব বেশি আফসোস করি না। কারণ সেই ভুলগুলোই আমাকে শিখিয়েছে—জীবনে পথ হারানো বড় কথা নয়; পথ হারিয়ে সেখানে বসে থাকাই বড় কথা।

সামনে পথ থাকলে হাঁটতে হবে। প্রয়োজনে পথ বদলাতে হবে। ভুল হলে আবার শুরু করতে হবে। আর কখনো যদি এমন হয় যে পাশে কেউ নেই, সিদ্ধান্তটি শুধু আমাকেই নিতে হবে, তখন রবীন্দ্রনাথের সেই কথাটি মনে রাখব—

“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে
তবে একলা চলো রে।”

আর যদি সামনে পথটি অচেনা হয়, তখন নজরুলের পথিকের সেই অদম্য চলার ভাবনাটি মনে রাখব।

অচেনা পথ মানেই থেমে যাওয়া নয়। সামনে কী আছে তা পুরোপুরি না জানলেও, যতটুকু পথ দেখা যায় ততটুকু সাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়।

কারণ শেষ পর্যন্ত গন্তব্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—আমরা থেমে থাকিনি, আমরা পথ চলেছি।