বাংলা কণ্ঠে শুনতে বোতামটি চাপুন।
পথচলা
ছোটবেলায় “পথ” বলতে আমি শুধু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার রাস্তা বুঝতাম—কাঁচা রাস্তা, পাকা রাস্তা, নদীপথ, ট্রেন কিংবা বাসের পথ। তখন রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের পথ নিয়ে লেখা গান বা কবিতা মাঝে মাঝে শুনতাম, কিন্তু সেগুলোর গভীর অর্থ বুঝতাম না।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করলাম, তাঁরা শুধু রাস্তার কথা বলেননি; জীবনের পথের কথাও বলেছেন। আমরা সবাই জীবনের একটি পথে হাঁটি। কেউ আগে শুরু করি, কেউ পরে। তবে একসময় সবার পথই শেষ হয়।
ছোটবেলায় পাড়ার কোনো দাদা-দাদি বা বয়স্ক কেউ মারা গেলে খুব বেশি কিছু ভাবতাম না। মনে হতো, তাঁর তো অনেক বয়স হয়েছে—এটাই স্বাভাবিক। একটু মন খারাপ হতো, তারপর আবার খেলাধুলা বা পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে যেতাম। মৃত্যু তখন মনে হতো অন্য মানুষের ব্যাপার।
ধীরে ধীরে বড় হলাম। কলেজে ভর্তি হলাম, চাকরি শুরু করলাম, বিয়ে করে সংসার শুরু করলাম, ছেলে-মেয়েদের বড় করলাম। জীবন ও সংসারের নানা ব্যস্ততায় সময় কেটে যেতে লাগল। এর মধ্যে দাদা-দাদির বয়সী প্রায় সবাই একে একে চলে গেলেন। এরপর বাবা-মায়ের বয়সী মানুষদের মৃত্যুর খবর শুনতে শুরু করলাম। কোনো পরিচিত বয়স্ক মানুষ মারা গেলে নিজের বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ত এবং মন খারাপ হতো। কিন্তু তখনও মনে হতো, আমাদের সামনে তো অনেক সময় আছে।
কিন্তু কখন যে সেই “অনেক সময়” কমে গেল, বুঝতেই পারিনি! এখন প্রায়ই স্কুলের বন্ধু, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী, পরিচিতজন কিংবা সমবয়সীদের মৃত্যুর খবর পাই। তখন আর মনে হয় না যে এটা শুধু অন্য কারও ঘটনা। মনে হয়, আমিও তো একই পথে হাঁটছি। শুধু আমার পথটা হয়তো এখনও কিছুটা বাকি। কবি নজরুল ইসলাম তাঁর “পথচারী” কবিতায় লিখেছেন—
“কে জানে কোথায় চলিয়াছি ভাই মুসাফির পথচারি,
দু’ধারে দু’কুল দুঃখ-সুখের—মাঝে আমি স্রোত-বারি!”
এই দুইটি লাইনে কবি যেন জীবনের পুরো পথচলার একটি ছবি এঁকেছেন। আমরা জানি না সামনে ঠিক কোথায় যাব, কতটা পথ বাকি, কোথায় গিয়ে থামতে হবে। আমাদের পথের দুই পাশে যেমন সুখ আছে, তেমনি দুঃখও আছে। এই দুইয়ের মাঝ দিয়েই আমাদের চলতে হচ্ছে।
গত কয়েক বছরে জীবনের খুব কাছের কয়েকজন মানুষকে হারিয়েছি। কেউ কেউ খুব হঠাৎ করেই চলে গেছে। তাদের সঙ্গে আরও কিছু কথা বলার ইচ্ছা ছিল, আরও কিছু সময় কাটাব বলে ভাবছিলাম, কোথাও একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেসব আর হবে না।
আমি আমেরিকা থেকে প্রায় প্রতি বছরই একবার দেশে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু দেশে গেলেই নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, আর সময় খুব দ্রুত চলে যায়। ফিরে আসার সময় মনে হয়, যাদের সঙ্গে একটু বসে গল্প করব, সময় নিয়ে কথা বলব, কোথাও একসঙ্গে যাব ভেবেছিলাম—সেটা আর হলো না।
জীবনে আমরা অনেক কিছু “পরে করব” বলে রেখে দিই। এই ব্যস্ত জীবনে সবসময়ই মনে মনে ভাবি—পরে সময় হবে, পরে দেখা হবে, পরে কোথাও যাব। কিন্তু এখন বুঝি, সেই “পরে” সব সময় আসে না।
তাই এখন মনে হয়, প্রিয় কাউকে কিছু বলতে চাইলে বেশি দেরি না করে বলাই ভালো। কারও সঙ্গে দেখা করতে চাইলে সুযোগ থাকতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেখা করা ভালো। কোথাও যেতে ইচ্ছা হলে সবসময় অপেক্ষা না করে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। কারণ সময় চলে গেলে অনেক কিছু আর ফিরে আসে না। আর আমাদের সামনে যে সময় আছে, সেটাও যে খুব বেশি নয়—এ কথাটাও এখন আগের চেয়ে বেশি মনে হয়।
পথ চলতেই তো আনন্দ
এই বয়সে এসে জীবনের পথটাকে একটু অন্যভাবে দেখতে শুরু করেছি। আগে মনে হতো, জীবনের লক্ষ্য হলো কোনো একটি জায়গায় পৌঁছানো। এখন মনে হয়, গন্তব্যে পৌঁছানোর পাশাপাশি কীভাবে পথ চললাম, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই কথাগুলো ভাবতে গেলে রবীন্দ্রনাথের একটি গান মনে পড়ে—“আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ।”
এখন আমার মনে হয়, জীবনে শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর মধ্যেই আনন্দ নেই। সেই গন্তব্যের জন্য অপেক্ষা করা, তার দিকে এগিয়ে যাওয়া এবং পথের নানা অভিজ্ঞতার মধ্যেও আনন্দ আছে। যেমন ধরুন, ছোটবেলায় নানাবাড়ি যাওয়ার জন্য আমরা অপেক্ষা করতাম। যাওয়ার দিন কবে আসবে, সেই অপেক্ষাটাই ছিল এক ধরনের আনন্দ। আরও একটু বড় হলে পরীক্ষার ফলের জন্য অপেক্ষা করেছি, চাকরি পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছি, বিয়ে করেছি, সংসার করেছি, ছেলে-মেয়েদের বড় হওয়ার অপেক্ষা করেছি। প্রতিটি অপেক্ষার মধ্যেই আলাদা একটা আনন্দ ছিল।
চাকরির সময়ও মনে হতো, অবসর নিলে অনেক সময় পাব। তখন নিজের মতো করে ঘুরব, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাব, লিখব, পড়ব। শেষ পর্যন্ত অবসরও এসেছে। নিজের মনোবল ধরে রাখতে, মনকে তৈরি করছি এই ভেবে—অবসর মানে সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং নিজের ইচ্ছামতো কিছু করার জন্য জীবনের একটি নতুন অধ্যায়।
সম্ভবত এ কারণেই এখন ভ্রমণ করতে আমার বেশি ভালো লাগে। ভ্রমণে গেলে কিছুদিনের জন্য পরিচিত জীবন থেকে বের হয়ে আসা যায়। নতুন জায়গায় গিয়ে নতুন মানুষের জীবন দেখা যায়, নতুন ইতিহাস জানা যায়, আর নিজের জীবনকেও যেন একটু দূর থেকে দেখা যায়।
সম্প্রতি বাল্টিক-নর্ডিক এলাকায় অনেক বন্ধুর সঙ্গে একসঙ্গে কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করার সুযোগ হয়েছিল। এক শহর থেকে আরেক শহরে গিয়েছি। প্রতিটি জায়গার আলাদা ইতিহাস, আলাদা মানুষ, আলাদা জীবনযাত্রা। এসব দেখতে দেখতে নিজের জীবন নিয়েও অনেক কিছু ভেবেছি।
যেমন ধরুন, পুরোনো কোনো শহরের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, এই রাস্তায় কত মানুষ কত বছর ধরে হাঁটছে। আজ আমরা হাঁটছি, কিন্তু আমাদের আগে আরও কত মানুষ এই পথ দিয়ে গেছে। আবার পুরোনো কোনো বাড়ি দেখলেও একই কথা মনে হয়। একসময় সেখানে মানুষ থাকত, তাদের পরিবার ছিল, আনন্দ ছিল, দুঃখ ছিল। তারা হয়তো এখন কেউ নেই, তাদের পথ চলা শেষ। কিন্তু বাড়িটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। সমুদ্রের কাছে দাঁড়ালেও এমন কিছু কথা মনে হয়। সমুদ্র হাজার হাজার বছর ধরে আছে। কত মানুষ এসেছে, কত মানুষ চলে গেছে। আমরা কিছুদিনের জন্য পৃথিবীতে আসি, নিজের মতো করে জীবন কাটাই, তারপর চলে যাই। পৃথিবী কিন্তু থেমে থাকে না।
এসব দেখলে নিজের জীবনকে খুব ছোট মনে হয়। আমরা জীবনের অনেক সময় ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিই। ভাবি—পরে ঘুরব, পরে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করব, পরে নিজের জন্য সময় দেব। কিন্তু এখন মনে হয়, সবকিছুর জন্য সেই “পরে”-র অপেক্ষা করা ঠিক নয়। তাই ভ্রমণ আমার কাছে শুধু বেড়ানো নয়। নতুন জায়গা দেখার পাশাপাশি নিজের জীবন নিয়েও ভাবার একটি সুযোগ।
জীবনের পথ
আজ এই বয়সে এসে পেছনে তাকালে দেখি, জীবনে অনেক পথ পেরিয়ে এসেছি। শৈশবের গ্রামের পথ, ছাত্রজীবনের শহরের পথ, বাংলাদেশের চাকরির পথ, সৌদি আরবের দিনগুলোর পথ, উত্তর আমেরিকায় নতুন জীবন শুরু করার পথ, সংসারের পথ, ছেলে-মেয়েদের বড় করার পথ, দীর্ঘ চাকরিজীবনের পথ এবং এখন অবসরের পথ—সব মিলিয়ে অনেকটা পথ চলে এসেছি।
কত মানুষ এই পথের সঙ্গী হয়েছে। কেউ অনেক দূর পর্যন্ত সঙ্গে থেকেছে, কেউ মাঝপথে থেমে গেছে। কেউ আবার হঠাৎ করেই পথ ছেড়ে চলে গেছে। পেছনে তাকালে বুঝি, জীবনের পথ শুধু জায়গা বদলের পথ নয়; মানুষ, সম্পর্ক, স্মৃতি, সুখ-দুঃখ—সবকিছু মিলিয়েই এই পথ।
এখন সামনে আর কতটা পথ আছে, সেটা জানি না। তবে একটা জিনিস বুঝতে শিখেছি—শুধু গন্তব্যের দিকে তাকিয়ে থাকলে পথের অনেক কিছুই দেখা হয় না। তাই যতদিন পথ আছে, পথ চলাটাকে উপভোগ করতে চাই। প্রিয় মানুষদের সঙ্গে সময় কাটাতে চাই। সুযোগ হলে নতুন জায়গায় যেতে চাই। পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে চাই। পুরোনো স্মৃতিগুলো মনে করতে চাই। আর প্রতিদিনের ছোট ছোট আনন্দগুলোকেও উপভোগ করতে চাই।
জীবনের শেষ কোথায়, সেটা আমরা কেউ জানি না। কিন্তু যতদিন পথ চলার সুযোগ আছে, সেই পথটা কীভাবে কাটাব—সেটা কিছুটা হলেও আমাদের হাতে। হয়তো এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—গন্তব্য একদিন আসবেই, কিন্তু তার আগে যে দীর্ঘ পথটা আমাদের পাড়ি দিতে হয়, সেটাই আসলে জীবন। তাই এখন রবীন্দ্রনাথের সেই কথাটি আমার কাছেও আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থপূর্ণ মনে হয়— “আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ।”