স্মৃতিকথা · Memoir

হিজরতের পথে আমার দিনগুলো

সূর্যাস্তের আলোয় একটি বিস্তৃত প্রাকৃতিক দৃশ্য
← সব লেখা

বাংলা কণ্ঠে শুনতে বোতামটি চাপুন।

পরিষ্কার নীল আকাশ—কোথাও এক টুকরো মেঘ নেই। একদিকে বিশাল, ন্যাড়া পাথুরে পাহাড়; অন্যদিকে যতদূর চোখ যায়, শুধু ধু-ধু মরুভূমি। দু-একটি মরূদ্যান ছাড়া কোথাও কোনো গাছপালা নেই। চারপাশে গভীর নীরবতা। মাঝে মাঝে অনেক দূরে দু-একজন বেদুইনকে দেখা যায়—উট, ছাগল কিংবা ভেড়ার পাল নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এই প্রতিকূল অথচ অপূর্ব প্রকৃতির মাঝেই ছিল আমাদের অফিস-কাম-রেসিডেন্স—মক্কা-মদিনা মহাসড়কের ছয় নম্বর অংশ। সময়টা ১৯৮২–৮৩ সাল।

এখানে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালে মনে হতো, সভ্যতার কোলাহল থেকে যেন বহু দূরে চলে এসেছি। কোথাও কোনো যানবাহনের শব্দ নেই, মানুষের কথাবার্তা নেই—শুধু বাতাসের মৃদু সো সো শব্দ। অথচ এই নির্জন মরুভূমি আর পাথুরে পাহাড়ের বুক চিরে চলে যাওয়া পথটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় দেড় হাজার বছরের এক অসাধারণ ইতিহাস।

৬২২ খ্রিস্টাব্দের হিজরত ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। মক্কার নির্যাতন ও প্রতিকূল পরিবেশ পেরিয়ে হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর প্রিয় সাহাবি হযরত আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে মক্কা থেকে মদিনার উদ্দেশে হিজরত করেন। প্রায় দেড় হাজার বছর আগে, আমি যে ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে আছি, তার আশপাশ দিয়েই হিজরতের সেই ঐতিহাসিক যাত্রাপথ অতিক্রম করেছিলেন তাঁরা। আজ সেই দুর্গম মরুভূমি ও পাথুরে পাহাড়ের দিকে তাকালে মনে হয়, ইতিহাস যেন এখানে খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।

মক্কা-মদিনা মহাসড়ক

আজকের মক্কা-মদিনা মহাসড়কটি ১৯৮৫ সালে চালু হয়। প্রায় ৪২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই আধুনিক মহাসড়কটি ছয় লেনের—তিন লেন একদিকে, তিন লেন অন্যদিকে; মাঝখানে রয়েছে প্রশস্ত ডিভাইডার। মহাসড়কটি চালু হওয়ার পর মক্কা থেকে মদিনায় সড়কপথে যাতায়াত অনেক দ্রুত ও সহজ হয়ে যায়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বর্তমানে গাড়িতে এই পথ পাড়ি দিতে প্রায় চার ঘণ্টা সময় লাগে।

এই মহাসড়কটি নির্মাণের আগে সৌদি যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গবেষণা করে হযরত মুহাম্মদ (সা.) যে পথ দিয়ে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছিলেন, সেই ঐতিহাসিক পথের এলাইনমেন্ট নির্ধারণের চেষ্টা করে। এরপর আধুনিক এই মহাসড়কটি হিজরতের সেই ঐতিহাসিক পথের যতটা সম্ভব কাছাকাছি করিডোর ধরে নির্মাণ করা হয়েছে। এ কারণেই আমার কাছে এই মহাসড়কটির তাৎপর্য অনেক বেশি।

এই প্রোজেক্টে কাজ করার প্রথম দিকে, অর্থাৎ এই মহাসড়ক নির্মাণের সময়, আমি এই করিডোর দিয়ে অসংখ্যবার যাতায়াত করেছি। কখনো রাত জেগে সেতু নির্মাণের কাজ তদারকি করেছি, আবার কখনো কন্ট্রাক্টরের ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে রাস্তার অ্যালাইনমেন্ট নির্ধারণ করেছি। তাই এই পথের ধুলো, রোদ আর নির্জনতার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি

১৯৮২ সালের ২৮ ডিসেম্বর সৌদিয়ার একটি ফ্লাইটে ঢাকা থেকে রিয়াদে যাই। চাকরি হয়েছিল ‘আল-মুহান্দিস নিজার কুর্দি’ নামের একটি কনসালটিং ফার্মে। আমার দায়িত্ব ছিল সৌদি সরকারের পক্ষে মক্কা-মদিনা মহাসড়কের নির্মাণকাজ তদারকি করা। ‘আল-মুহান্দিস’ শব্দের অর্থ ‘ইঞ্জিনিয়ার’, আর নিজার কুর্দি একটি ব্যক্তিনাম—অর্থাৎ ইঞ্জিনিয়ার নিজার কুর্দির নামেই ফার্মটির নামকরণ।

প্রতিষ্ঠানটি ছিল ছোট। তবে মক্কা-মদিনা মহাসড়কের নির্মাণ তদারকির দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী তারা অনেক ইঞ্জিনিয়ার ও ইন্সপেক্টর নিয়োগ করে। ফার্মটির প্রধান অফিস ছিল রিয়াদে। সেখানে কাজে যোগ দেওয়ার পরদিনই একটি ফ্লাইটে জেদ্দার উদ্দেশে রওনা দিই আমার কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য।

মক্কা-মদিনা মহাসড়ক নির্মাণের সময় প্রকল্পটি নয়টি অংশে ভাগ করা হয়েছিল। মদিনার দিকের অংশ ছিল পার্ট এক, আর মক্কার দিকের অংশ ছিল পার্ট আট। পার্ট সাতের মাঝামাঝি থেকে একটি শাখা সড়ক জেদ্দার দিকে চলে গিয়েছিল, যার নম্বর ছিল নয়। আমাকে যোগ দিতে বলা হয়েছিল পার্ট ছয়ে।

জেদ্দা বিমানবন্দরে নেমে বাইরে এসে দেখি, আমাকে নিতে কোনো ড্রাইভার নেই। এদিক-ওদিক তাকিয়েও কাউকে দেখতে না পেয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। অনেকক্ষণ পর একজন সৌদি ড্রাইভারকে দেখতে পেলাম। তার হাতে একটি কাগজ, তাতে আমার নাম লেখা। নামটি অবশ্য আরবিতে এমনভাবে লেখা ছিল যে আমি বুঝতে পারছিলাম না। আমি আরবি পড়তে পারি, কিন্তু সেই লেখাটি পড়তে বেশ কষ্ট হচ্ছিল।

অবশেষে ড্রাইভারকে খুঁজে পেয়ে স্বস্তি পেলাম। মালপত্র নিয়ে তার গাড়িতে উঠে বসলাম। তার নাম আব্দাল্লাহ। সে ছিল একজন সৌদি বেদুইন।

আব্দাল্লাহ আপনমনে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল। সে আমার ভাষা বুঝতে পারছে না, আমিও তার ভাষা বুঝতে পারছি না। ফলে শুরুতেই এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। জেদ্দা বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে গাড়ি যখন মরুভূমির পথে এগিয়ে চলল, চারদিকে শুধু ধু-ধু মরুভূমি আর মাঝে মাঝে পাহাড়। কোথাও তেমন গাছপালা নেই—শুধু দু-একটি মরূদ্যান। এমন দৃশ্য আমার জন্য ছিল একেবারেই নতুন। কেমন যেন একটু ভয়ও লাগছিল।

কিছুদূর যাওয়ার পর আব্দাল্লাহ রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচে একটি জায়গায় গাড়ি থামাল। এটাকে রেস্তোরাঁ বলব কি না জানি না। রাস্তার পাশে একটি বড় তাঁবু; এক পাশে চুলা, আর অন্য পাশে বড় একটি কার্পেট বিছানো। মরুভূমির ধুলা-বালিতে কার্পেটের ওপরও যেন ধুলোর একটি স্তর জমে আছে।

আব্দাল্লাহ সেই কার্পেটের ওপর বসে বেশ সময় নিয়ে খাবার খেল। আমাকে ইশারায় খেতে বলেছিল। কিন্তু আমি শুধু এক কাপ চা নিলাম। ধুলা-বালির মধ্যে বসে সেই চা-টাও আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছিল। চা পরিবেশন করা হয়েছিল হাতলবিহীন স্বচ্ছ কাচের গ্লাসে। সেই গ্লাসে চা দেখতে বেশ সুন্দর লাগছিল।

খাওয়া শেষ করে আব্দাল্লাহ আবার গাড়ি চালানো শুরু করল। কিন্তু ভুল করে আমাকে পার্ট ছয়ের বদলে পার্ট পাঁচে নিয়ে গেল। সেখানে আমার থাকার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। পরে সেখানকার রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং সেই রাতের জন্য আমার থাকার ব্যবস্থা করেন। পরদিন সকালে তিনি একটি গাড়িতে করে আমাকে পার্ট নম্বর ছয়ে পাঠিয়ে দেন। অবশেষে পৌঁছাই আমার নির্ধারিত কর্মস্থলে।

প্রতিটি পার্টের নির্মাণকাজ তদারকির জন্য একটি করে অফিস-কাম-রেসিডেন্স কমপ্লেক্স তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ারসহ চারজনের জন্য আলাদা রেসিডেন্সিয়াল ভিলা ছিল। ছিল একটি অফিস ভবন, একটি ভবনে রান্নাঘর ও খাবার ঘর এবং একটি কমন রুম। কমন রুমে টেবিল টেনিস খেলার ব্যবস্থা ছিল। অবসর সময়ে সিনেমা দেখার জন্য ছিল একটি টিভি ও ক্যাসেট প্লেয়ার। ইন্সপেক্টরদের থাকার জন্য ছিল আরও একটি লম্বা ভবন, যেখানে কয়েকটি কক্ষ ছিল। পুরো কমপ্লেক্সটি একটি বাউন্ডারি ওয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল।

মাঝে মাঝে কমপ্লেক্সের বাইরে একা নীরবে দাঁড়িয়ে মরুভূমি ও পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতাম। সেই বিশাল নীরবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রায় ১,৪০০ বছর আগের কঠিন হিজরতের কথা ভাবতাম। তখন মনে হতো, ইতিহাস যেন এই নির্জন প্রান্তরে আজও জীবন্ত হয়ে আছে।

আমাদের পার্টে একজন রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ারের পাশাপাশি একজন করে সিভিল, ব্রিজ ও ম্যাটেরিয়াল ইঞ্জিনিয়ার দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁদের সঙ্গে কয়েকজন ইন্সপেক্টরও থাকতেন, যারা মাঠপর্যায়ে নির্মাণকাজ তদারকি করতেন। আমাকে প্রথমে ম্যাটেরিয়াল ইন্সপেক্টর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও পরে ব্রিজ ইন্সপেক্টরের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

প্রকল্পের কাজ তদারকির জন্য আমাদের গাড়ি ও ড্রাইভার দেওয়া হয়েছিল। আমার ড্রাইভার ছিল একজন সৌদি বেদুইন। প্রকল্পে কর্মরত বেশির ভাগ ড্রাইভারই ছিল সৌদি বেদুইন; অল্প কয়েকজন পাকিস্তানি ও ফিলিপিনোও ছিলেন।

সৌদি ড্রাইভারদের নিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে নানা অসুবিধা হচ্ছিল—তারা ঠিকমতো কাজ করত না, কথাও শুনত না। তাই কনট্রাক্টর আমাকে একজন বাংলাদেশি ড্রাইভার দিয়েছিল। তবে তার সৌদি ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না। ফলে প্রকল্প এলাকার ভেতরে যাতায়াতের জন্য সে সুবিধাজনক হলেও শহরে তাকে নিয়ে যাওয়া নিরাপদ ছিল না। অবশ্য প্রয়োজন হলে মাঝে মাঝে মক্কা, মদিনা ও জেদ্দাতেও তাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছি।

চাকরির প্রথম দিকে একবার একটি কাজে বেদুইন ড্রাইভার নিয়ে জেদ্দা গিয়েছিলাম। তাকে বলেছিলাম, “আমি দুই ঘণ্টা পর ফিরে আসব।” কিন্তু কাজ শেষ করতে আমার প্রায় তিন ঘণ্টা লেগে গেল। ফিরে এসে দেখি, ড্রাইভার নেই, গাড়িও নেই। বেশ বিপদে পড়ে অনেক কষ্টে কর্মস্থলে ফিরতে হলো।

অফিসে ফিরে দেখি, ড্রাইভার সেখানে বসে আছে। জিজ্ঞেস করতেই সে বলল, “তুমি দুই ঘণ্টা পরে আসবে বলেছিলে। আমি দুই ঘণ্টা ত্রিশ মিনিট অপেক্ষা করে চলে এসেছি।”

ঘটনাটি এখন মনে হলে বেশ মজার লাগে, যদিও সেদিন বেশ বিপদেই পড়েছিলাম। এরপর ওকে নিয়ে আর কোনোদিন দূরে কোথাও যাইনি। প্রকল্প তদারকির প্রয়োজনে অনেক সময় নিজেই গাড়ি চালাতাম, যদিও তখন আমার সৌদি ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না। প্রত্যন্ত প্রকল্প এলাকায় সাধারণত পুলিশের তেমন তৎপরতা ছিল না। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই কিছুদিন এভাবেই চলতে হয়েছিল।

আমার দেখা বেদুইন জীবন

মহাসড়কের নির্মাণকাজ তদারকি করতে গিয়ে বেদুইনদের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। বিশাল মরুভূমির মধ্যে তাদের চলাফেরা ছিল একেবারেই স্বাভাবিক ও স্বচ্ছন্দ। অনেক সময় দেখতাম, একজন বেদুইন ছাগল বা ভেড়ার পাল নিয়ে ধীরে ধীরে মরুভূমির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। হাতে থাকত বেশ বড় একটি বাঁকা ছুরি বা রামদার মতো অস্ত্র। প্রথম দিকে সেটি দেখে কিছুটা ভয় লাগত। মনে হতো, এত বড় অস্ত্র হাতে নিয়ে একজন মানুষ একা মরুভূমিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে! পরে বুঝতে পারি, এটি মূলত আত্মরক্ষার জন্য সঙ্গে রাখা হতো; কাউকে ভয় দেখানো বা ক্ষতি করার জন্য নয়। সেই কঠিন ও নির্জন পরিবেশে এটিও ছিল তাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ।

বেদুইনদের পিকআপ ট্রাকেও অনেকবার দেখেছি। সামনে চালকের আসনে একজন পুরুষ, আর পেছনের খোলা অংশে অনেক নারী ও শিশু বসে আছে। নারীরা সাধারণত বোরকা বা কালো পোশাকে আবৃত থাকত। খোলা পিকআপের পেছনে তারা অনেকটা গাদাগাদি করে বসে থাকত—আমাদের চোখে দৃশ্যটি ছিল বেশ অস্বাভাবিক। তখনকার সৌদি আরবের প্রত্যন্ত মরুভূমি অঞ্চলে এ ধরনের যাতায়াত যে কতটা স্বাভাবিক ছিল, তা দেখে বুঝতে পারতাম। শহরের আধুনিক জীবন থেকে এই জীবনযাত্রার পার্থক্য ছিল চোখে পড়ার মতো।

আরেকটি দৃশ্য আমার এখনও মনে আছে। অনেক রাতে প্রকল্পের কাজ শেষ করে বা সেতুর কাজ দেখতে গিয়ে দূরে মরুভূমির মধ্যে ছোট ছোট আলো দেখতে পেতাম। আশপাশে কোনো বাড়িঘর বা বসতি নেই—শুধু অন্ধকার মরুভূমি। দূরের সেই আলো দেখে বুঝতাম, হয়তো কোথাও বেদুইনদের ক্যাম্প রয়েছে। কাছে গেলে হয়তো একটি তাঁবু, কয়েকটি পরিবার, উট বা ছাগল-ভেড়ার পাল এবং রাতের খাবারের আয়োজন—এই নিয়েই তাদের ছোট্ট পৃথিবী। দূর থেকে সেই ক্ষীণ আলোকে মনে হতো, বিশাল অন্ধকার মরুভূমির মধ্যে জীবনের ছোট্ট একটি চিহ্ন জ্বলছে।

দিনের বেলায়ও কখনো কখনো রাস্তা থেকে কিছুটা দূরে কালো তাঁবু দেখতে পেতাম। তাঁবুর আশপাশে ছাগল, ভেড়া বা উট ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোথাও একজন পুরুষ বসে আছে, কোথাও কয়েকজন একসঙ্গে কথা বলছে। কোনো কোনো জায়গায় আগুনের ধোঁয়াও দেখা যেত। তখন মনে হতো, আধুনিক মহাসড়কের এত কাছে থেকেও তারা যেন নিজেদের পুরোনো জীবনধারার মধ্যেই বসবাস করছে।

এই দৃশ্যগুলো আমার কাছে শুধু বেদুইনদের জীবনযাত্রার ছবি ছিল না; এগুলো ছিল সেই সময়ের সৌদি আরবের প্রত্যন্ত মরুভূমির জীবনের বাস্তব চিত্র। আজকের সৌদি আরবের নগরজীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তবে আমার দেখা সেই বেদুইনদের জীবনযাত্রার কিছু বৈশিষ্ট্য এখনও টিকে আছে বলে জানা যায়। সৌদি সরকার বেদুইনদের স্থায়ীভাবে বসবাসে উৎসাহিত করার জন্য বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক ভবন, স্কুল ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা তৈরি করেছে। কিন্তু অনেকেই এখনও শহুরে জীবনের বদলে তাদের ঐতিহ্যবাহী, অপেক্ষাকৃত স্বাধীন জীবনযাপনকে বেশি পছন্দ করে।

শেষ কথা

এখন প্রায় চল্লিশ বছর পরে ফিরে তাকালে মনে হয়, মক্কা-মদিনা মহাসড়কটি আমার জীবনের শুধু একটি চাকরি বা প্রকৌশল কাজের অংশ ছিল না। এটি হয়ে আছে আমার জীবনের একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা।

সেই নির্জন মরুভূমি, পাথুরে পাহাড় আর বেদুইনদের সহজ-সরল জীবন আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। হাজার বছর আগে যে পথ দিয়ে নবীজি (সা.) ও তাঁর সাহাবি হযরত আবু বকর (রা.) কষ্ট, ত্যাগ ও বিশ্বাস নিয়ে হিজরত করেছিলেন, সেই ঐতিহাসিক ভূখণ্ডের কাছাকাছি পথেই আমার কর্মজীবনের শুরুর দিনগুলো কেটেছে।

রোদ, ধুলো আর কঠিন পরিশ্রমের সেই দিনগুলো তখন হয়তো কষ্টের ছিল। কিন্তু আজ ফিরে তাকালে সেগুলোই মনে হয় আমার জীবনের অমূল্য স্মৃতি।