বাংলা কণ্ঠে শুনতে বোতামটি চাপুন।
দীর্ঘ কর্মজীবনের ব্যস্ততায় পৃথিবীর বহু দেশের নাম আমাদের কাছে পরিচিত ছিল শুধু মানচিত্রে আর বইয়ের পাতায়। দেখার ইচ্ছে ছিল, স্বপ্ন ছিল—কিন্তু সেই স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সুযোগ হয়নি। কাজের চাপ, সময়ের অভাব আর নানা দায়বদ্ধতার ভিড়ে ভ্রমণ সবসময়ই তালিকার নিচের দিকে থাকত। এখন ইউটিউবের কল্যাণে অনেক কিছু দেখা যায় ঠিকই, কিন্তু তাতে মন ভরে না; বরং না-পাওয়ার আফসোসটাই যেন আরও বেড়ে যায়।
অবসরজীবনের শুরুতেই মনে হলো, বহুদিন ধরে মনের ভেতর জমে থাকা ইচ্ছেগুলো একে একে পূরণ করার সময় এসেছে। সেই ভাবনা থেকেই আমরা বেছে নিয়েছিলাম ১১ দিনের ডানুব (Danube) নদীর রিভার ক্রুজ।
ডানুবের শান্ত স্রোতে ভেসে ভেসে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া, জানালার পাশে বসে ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকা প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা, আর হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ ইউরোপের শহরগুলোকে কাছ থেকে দেখা ও অনুভব করা—এই ছিল আমার বহুদিনের ইচ্ছা।
ক্রুজের সবচেয়ে বড় সুবিধা—আমরা একই কেবিনে থাকি, আর জাহাজ আমাদের এক শহর থেকে অন্য শহরে নিয়ে যায়। জাহাজেই সব খাবারের ব্যবস্থা, রুম সার্ভিসসহ প্রয়োজনীয় সব সুবিধা থাকে। ফলে বারবার হোটেল বদলানো বা লাগেজ গোছানোর ঝামেলা থাকে না।
ডানুব নদী ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। জার্মানির ব্ল্যাক ফরেস্ট থেকে উৎপন্ন হয়ে এটি বয়ে গেছে দশটি দেশের মধ্য দিয়ে। নদীর দুই পাশের প্রকৃতি সত্যিই চোখ জুড়ানো—কখনও উঁচু পাহাড়, কখনও মাইলের পর মাইল ঘন জঙ্গল, আবার কোথাও পরিপাটি সাজানো ছোট ছোট বাড়িঘর। তবে ডানুবের পরিচয় শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি হাজার বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। যাত্রাপথে আমরা বহু ধ্বংসাবশেষ দেখেছিলাম, দেখেছিলাম পুরোনো দুর্গ যেখানে একসময় যুদ্ধের কামান বসানো ছিল। এসব দৃশ্য দেখে মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল - "এই নদী কত যুদ্ধের সাক্ষী, কত রক্তপাত তার বুকে ঘটেছে। আর আমরা সেই পথেই ভেসে চলেছি, ইতিহাসের কথা ভাবছি।"
ছবি ১- দানুব নদীর ম্যাপ- দশটি দেশের (জার্মান থেকে রোমানিয়া) মাঝ দিয়ে গেছে।
প্রাচীনকালে ডানুব ছিল রোমান সাম্রাজ্যের উত্তর সীমান্ত। প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যের জন্য রোমানরা এই নদীকে ব্যবহার করত। নদীর তীর ঘেঁষে তারা দুর্গ, শহর ও সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলে। রোমান সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ার পর এই অঞ্চল দিয়ে একের পর এক শক্তিধর জাতি ও সাম্রাজ্য প্রবেশ করে। ডানুব তখন হয়ে ওঠে সংঘর্ষ ও ক্ষমতার লড়াইয়ের পথ। নতুন রাজ্য গড়ে ওঠে, আবার ভেঙেও যায়।
১৫শ থেকে ১৭শ শতকে ডানুব ছিল অটোমান সাম্রাজ্য ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু। অটোমানরা বলকান অঞ্চল দখল করে ডানুব পর্যন্ত পৌঁছেছিল। হাঙ্গেরি, সার্বিয়া ও বুলগেরিয়ার বহু এলাকা দীর্ঘদিন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। এই লড়াই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলেছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ডানুবের তীরে জন্ম নিয়েছিল নতুন নতুন দেশ—অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, চেকোস্লোভাকিয়া ও যুগোস্লাভিয়া। নদীটি তখন আর একক কোনো সাম্রাজ্যের নয়; এটি হয়ে ওঠেছিল বহু দেশের সীমান্ত ও সংযোগস্থল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডানুব আবার রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়েছিল-এক পাশে পশ্চিম ইউরোপের গণতান্ত্রিক দেশগুলো, অন্য পাশে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ব্লক।
আজ ডানুবকে দেখে আর যুদ্ধের প্রতীক মনে হয় না। বরং এটি সহযোগিতা ও সংযোগের প্রতীক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহু দেশকে এই নদী এক সুতোয় বেঁধেছে। বাণিজ্য, পরিবহন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ে ডানুব এখন একটি যৌথ নদী—যেখানে অতীতের সংঘাত পেরিয়ে বর্তমানের সহাবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আমাদের এই ক্রুজ যাত্রায় আমরা সাতটি দেশের মোট নয়টি শহরে সময় কাটিয়েছিলাম। ভোরে জাহাজ এসে শহরের ঘাটে নোঙ্গর করতো। আমরা সারাদিন শহরে ঘুরে বেরাতাম আর সন্ধ্যায় ক্লান্ত হয়ে জাহাজে ফিরতাম। তারপর সারারাত জাহাজ চলতো এক শহর থেকে অন্য শহরে। পরের দিন আবার নতুন এক শহর। আমরা যে শহরগুলোতে ঘুরেছিলাম, সেগুলো হলো-
১: ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া
২: ব্রাতিস্লাভা, স্লোভাকিয়া
৩-৪: বুদাপেস্ট ও মোহাচ, হাঙ্গেরি
৫: ভুকোভার, ক্রোয়েশিয়া
৬-৭: নোভি সাদ ও বেলগ্রেড, সার্বিয়া
৮: ভিডিন, বুলগেরিয়া ও
৯: বুখারেস্ট, রোমানিয়া
দেশগুলো খুব কাছাকাছি হলেও প্রতিটি শহর যেন আলাদা আলাদা গল্প নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছিল।
এই ভ্রমণটা আমি একা করিনি। বাংলাদেশি-অরিজিন দশটি পরিবারের বিশ জন সদস্য মিলে পরিকল্পনা করা হয়েছিল পুরো যাত্রা—২০২৫ সালের ১২ মে থেকে ২৫ মে পর্যন্ত। এর মধ্যে সাতটি পরিবার ক্যালিফোর্নিয়া থেকে, একটি ম্যাসাচুসেটস থেকে, আর আমরা দুই পরিবার ভার্জিনিয়া থেকে। পুরো ভ্রমণের লজিস্টিক, বুকিং ও পরিকল্পনার দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন ক্যালিফোর্নিয়ার দারা ভাই (মোস্তায়িন বিল্লা দারা)।
ছবি ২- আমরা ২০ জন বাংলাদেশী একসাথে ভ্রমন করেছিলাম।
আমার সহধর্মিণী ফাতেমা আর আমি ২০২৫ সালের ১১ মে, রবিবার সন্ধ্যা ৬:৩০টায় ওয়াশিংটন ডিসির ডালেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এয়ার ফ্রান্সের ফ্লাইটে ইউরোপের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলাম। আমাদের রুট ছিল—ওয়াশিংটন ডিসি–প্যারিস–ভিয়েনা। প্রায় নয় ঘণ্টার ফ্লাইট শেষে পরদিন সকাল ৮:০৫টায় আমরা প্যারিসের শার্ল দ্য গোল বিমানবন্দরে পৌঁছাই, নির্ধারিত সময়ের একটু আগেই। কিন্তু এখানেই যাত্রার প্রথম ধাক্কা—বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনার কারণে সকাল ৯:২০টার ভিয়েনাগামী ফ্লাইটটি আমরা মিস করি। বিষয়টি ছিল বেশ বিরক্তিকর। শেষ পর্যন্ত আমাদের ফ্লাইট পুনর্নির্ধারণ করা হয় বিকেল ৩টায়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে আমরা ভিয়েনার উদ্দেশে রওনা হই এবং বিকাল পাঁচটার দিকে হোটেলে পৌঁছাই।
ছবি ৩- প্যারিস চার্লস দ্য গোল বিমানবন্দরের টার্মিনালে।
ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া
ভিয়েনায় পৌঁছে প্রথম রাত কাটালাম স্থানীয় একটি হোটেলে। সন্ধ্যায় সবাই মিলে কাছের একটি তুর্কি রেস্তোরাঁয় ডিনার করলাম। খাবার শেষে হোটেলের লবিতে বসে জমে উঠল বাঙালির আড্ডা—যেটা ছাড়া আমাদের কোনো আনন্দই যেন সম্পূর্ণ হয় না। সেই আড্ডার মাঝেই হঠাৎ পরিচয় হলো ভিয়েনায় বসবাসকারী এক বাংলাদেশি দম্পতির সঙ্গে। জাহাঙ্গীর ভাই ও ভাবী হোটেলের সামনে হাঁটতে গিয়ে ওনাদের সাথে পরিচয় হয়। ভদ্রলোকের নাম সালমান কবির সোহাগ। তিনি পরিবার সহ হোটেলের পাশেই একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন। গভীর রাত পর্যন্ত গল্প চলল—ভিয়েনায় বাঙালিদের জীবন, কাজকর্ম, সংগ্রাম আর ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা শুনে বেশ ভালো লাগলো। বিদেশের মাটিতে হঠাৎ বাংলাদেশি মানুষ পেয়ে যাওয়ার অনুভূতি সব সময়ই আলাদা।
পরদিন ১৩ই মে সকালে সোহাগের পরামর্শে আমরা হোটেলে নাস্তা না করে কাছের একটি স্থানীয় রেস্তোরাঁয় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। রেস্তোরাঁটি হোটেল থেকে একটু দূরে ছিল। আজীবন আমি পাবলিক ট্রানজিট নিয়ে কাজ করেছি—ফলে যেখানেই যাই, স্থানীয় গণপরিবহন ব্যবহার করতে আমার ভালো লাগে। হোটেলের সামনে লাইট রেল দেখে সবাইকে বললাম, ট্রেনেই যাই। মাত্র দুই স্টপ। টিকিট কাটতে গিয়ে একটু ঝামেলা হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত ঠিকই পৌঁছে গেলাম। খাবার ছিল তুর্কি, সবই হালাল। খাবার ভালো, পরিবেশও আরামদায়ক। নাস্তার পর ধীরে ধীরে হেঁটে হোটেলে ফিরে এলাম।
ছবি ৪- ব্রেকফাস্ট খাওয়ার পর রেস্টুরেন্টের সামনে আমরা কয়েক জন।
দুপুরের দিকে হোটেল থেকে চেকআউট করে ট্যাক্সি নিয়ে আমরা নদীর ধারে জাহাজে উঠি। এখান থেকেই শুরু হলো আমাদের আসল রিভার ক্রুজ। নদীর ক্রুজ সমুদ্রের ক্রুজ থেকে বেশ আলাদা। সমুদ্রের জাহাজ বিশাল—অনেক সময় তিন হাজারের বেশি যাত্রী থাকে। আমাদের নদীর জাহাজটি ছিল ছোট, তিনতলা, যাত্রী প্রায় দেড়শ জন। এই ছোট আকারটাই আমার বেশি ভালো লেগেছে—কোলাহল কম, পরিবেশ অনেক বেশি ব্যক্তিগত। আমরা তিন তলা জাহাজের ওপরের তলায় ছিলাম।
ছবি ৫- আমাদের জাহাজ; ব্রাতিস্লাভার ঘাটে।
আমাদের জাহাজ ১৪ই মে বুধবার ভিয়েনাতে অবস্থান করে এবং ক্রুজ কর্তৃপক্ষ ভিয়েনা শহরে প্রায় ছয় ঘন্টার একটি বাস ভ্রমণের ব্যবস্থা করে। আমরা সবাই চারটি বড় বাসে সকাল নয়টায় রওনা দেই এবং বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বিকাল দুইটার দিকে জাহাজে ফিরে আসি। ভিয়েনা শহরটা প্রথম দেখাতেই খুব ভালো লাগে—পরিপাটি, শান্ত, সুসংগঠিত। সঙ্গীত, রাজকীয় স্থাপত্য ও শৈল্পিক ঐতিহ্যে ভরপুর এই শহর ইউরোপীয় সভ্যতার এক প্রতীক। অপেরা হাউস, শোনব্রুন প্রাসাদ, প্রশস্ত রাস্তা, সবকিছুতেই শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্যের নিখুঁত সমন্বয় চোখে পড়ে।
ছবি ৬- আমাদের হোটেলের সামনের রাস্তা। এই রাস্তায় স্ট্রিট কারও চলে।
আমাদের বাস প্রথমে হফবার্গ প্যালেসের (Hofburg Palace) পাশে থামে। নির্দেশনা ছিল—এক ঘণ্টার মধ্যে আশপাশটা ঘুরে দেখে ফিরে আসতে হবে। আমি ও ফাতেমা প্রথমে গিয়েছিলাম ইম্পেরিয়াল অ্যাপার্টমেন্টসে। সম্রাট ফ্রান্ৎস জোসেফের (Franz Joseph) বাসস্থান দেখে সত্যিই অবাক হয়েছিলাম। এত বড় সাম্রাজ্যের সম্রাট হয়েও তাঁর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ—লোহার খাট, অল্প কিছু আসবাব। পাশের ঘরগুলোতে সম্রাজ্ঞী সিসির (Empress Elisabeth (Sisi)) ব্যবহার করা আয়না, ব্যায়ামের সরঞ্জামসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র। সব মিলিয়ে রাজকীয় জীবনের এক ভিন্ন বাস্তবতা চোখে পড়ল।
ছবি ৭- হফবার্গ প্যালেসের সামনে ও পাসে তোলা দুইটি ছবি।
ঘুরতে ঘুরতে খিদে লাগায় ঢুকে পড়লাম সেই বিখ্যাত ডেমেল ক্যাফেতে (Café Demel)। এটি ভিয়েনার একটি ঐতিহ্যবাহী ও বিখ্যাত ক্যাফে, যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৭৮৬ সালে। এটাকে একটি মিউজিয়াম বললেও ভুল হবে না। আমরা দুজনে দুই টুকরো কেক খেলাম—স্বাদ সত্যিই মনে রাখার মতো। বোঝা যায় কেন শত বছর ধরে এই জায়গাটি মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে আছে।
ছবি ৮- বাস থেকে তোলা, অস্টিয়া পার্লামেন্ট ভবন।
খাওয়ার পর বেরিয়ে এসে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম হেলডেনপ্লাৎসে (Heldenplatz)। বিশাল খোলা জায়গা, চারপাশে ঐতিহাসিক ভবন। যেদিকে তাকাই সেদিকেই পর্যটকের ভিড়, ঘোড়ার গাড়ি আর মানুষের হাসি-আড্ডা। অথচ এই জায়গার ইতিহাস যে কত গুরুত্বপূর্ণ সেটা ভাবলে গা শিউরে ওঠে। সবচেয়ে বিতর্কিত ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে ১৯৩৮ সালের ১৫ মার্চ। সেদিন অসংখ্য অস্ট্রিয়ানের সামনে আডলফ হিটলার এখানে এসে অস্ট্রিয়াকে জার্মানির সঙ্গে যুক্ত করার ঘোষণা দেন। ভিয়েনা তখন নাৎসি জার্মানির অংশ হয়ে যায়। ১৯৪৫ সালে সোভিয়েত বাহিনী ভিয়েনা দখল করে; শহরে তীব্র লড়াই হয় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এখানকার রাস্তা দিয়ে হাঁটলে দেখা যায় সেই যুদ্ধের সময়কার চিহ্ন। আবার পাশেই অনেক মডার্ন দালান তৈরী হয়েছে।
ছবি ৯- হেলডেনপ্লাৎসে বাগানের এক পাশে তোলা ছবি।
এরপর একটু বিশ্রাম নিতে বুরগারটেন (Burggarten) পার্কের একদিকে বসে পড়ি। চারদিকে সবুজ, পাখির ডাক, আর সামনে মোৎসার্টের মূর্তি। ভিয়েনার মতো শহরে মোৎসার্টের মূর্তির সামনে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকাটাও মনে হচ্ছিল এক ধরনের ভ্রমণ।
তারপর আমরা ধীরে ধীরে বার্গ থিয়েটারের পাস দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অ্যালবার্টিনা মিউজিয়ামে (Albertina Museum) গেলাম। ভেতরের শিল্পকর্ম দেখার পর ছাদে উঠে দাঁড়ালাম। সেখান থেকে পুরো হফবার্গ এলাকা দেখা যায়। দুপুরের ঝকঝকে রোদের আলোয় শহরটা আরও সুন্দর লাগছিল।
ছবি ১০- বার্গ থিয়েটারের সামনে। এই থিয়েটার ভবন ১৮৮৮এ উদ্ভাবন করা হয়।
এরপর আমাদের বাস শহরের কেন্দ্রের কাছাকাছি এক জায়গায় থামে এবং আমাদেরকে একজন গাইড শহরের কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে এক ঘন্টা সময় ঘুরে দেখার জন্য নির্ধারণ করে দেয়।
ভিয়েনা সিটি সেন্টারে ঘুরে দেখা মানে ইতিহাস, সংস্কৃতি আর আধুনিক জীবনের সুন্দর এক মিল দেখা। শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে সুন্দর খোলা জায়গার নাম স্টেফান্সপ্লাৎস (Stephansplatz) চত্বর। এর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে বিশাল ও সুন্দর স্টেফান্সডোম গির্জা। গির্জার ভেতরে ঢুকে নীরব পরিবেশ আর শত শত বছরের পুরোনো স্থাপত্য মন ছুঁয়ে যায়। ফাতেমা হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে বাইরে এক বেঞ্চে বসে ছিল। আমি একাই ভিতরে গিয়েছিলাম।
স্টেফান্সপ্লাৎস থেকে চারদিকে ছড়িয়ে আছে ব্যস্ত হাঁটার রাস্তা আর রাস্তার দু’পাশে নামী ব্র্যান্ডের দোকান, ক্যাফে আর রেস্তোরাঁ। আমি আর ফাতেমা একটি আইসক্রিমের দোকানে গিয়ে দুই কোন আইসক্রিম নিয়ে রাস্তার পাশে থাকা বেঞ্চে বসে খাচ্ছিলাম আর চারিদিকের ট্যুরিস্টদের দেখছিলাম।
ছবি ১১- সেন্ট চার্লস চার্চ, ১৭৩৯ এ তৈরী।
ভিয়েনায় এসে কোনো কনসার্ট না দেখা মানে শহরটাকে পুরোপুরি না দেখা। তাই আগে থেকেই অর্কেস্ট্রা দেখার জন্য দুটো টিকিট কেটে রেখেছিলাম। সন্ধ্যা সাতটার দিকে জাহাজের ব্যবস্থাপনায় বাসে করে আমরা প্রায় ৪০ জন কনসার্ট দেখতে যাই। আমরা উপভোগ করি ভিয়েনার অন্যতম বিখ্যাত "Wiener Residenz Orchestra"-এর পরিবেশনা। মোৎসার্ট ও বেটোফেনের সঙ্গীত, তার সঙ্গে মনোমুগ্ধকর নৃত্য—সব মিলিয়ে একটি অসাধারণ সন্ধ্যা। ভিয়েনা এসে এমন একটি রাত না কাটালে সত্যিই মিস করতাম।
ছবি ১২- Wiener Residenz Orchestra পারফর্মেনেমেন্স।
রাত দশটার দিকে আমাদের জাহাজ ভিয়েনা ছেড়ে দেয়। জানালা দিয়ে শহরের আলো ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে দেখে মনে মনে বললাম, বিদায় ভিয়েনা।
ব্রাতিস্লাভা, স্লোভাকিয়া, ১৫ই মে বৃহস্পতিবার
সকালে ঘুম ভাঙার পর দেখি আমাদের জাহাজ স্লোভাকিয়ার রাজধানী ব্রাতিস্লাভার ঘাটে নোঙ্গর করে আছে। ভিয়েনা থেকে ব্রাতিস্লাভার দূরত্ব খুব বেশি না। ড্রাইভ করলে এক ঘন্টার বেশি লাগে না তবে জাহাজে মনে হয় কয়েক ঘন্টা লেগেছিল। আমরা জাহাজে সকালের নাস্তা খেয়ে সবাই একসাথে বাহির হলাম ঘুরতে।
ছবি ১৩- বামে ন্যাসনাল থিয়েটার; ডানে সিগিসমান্ড গেট।
জাহাজ থেকে নামার আগেই দূরে পাহাড়ের ওপর একটা বড় সাদা দুর্গ চোখে পড়ল—ব্রাতিস্লাভা ক্যাসেল। দেখে মনে হলো, অনেক বছর ধরে দাঁড়িয়ে থেকে পুরো শহরটাকে শাসন করছে। জাহাজ থেকে নেমে আমরা সবাই ধীরে ধীরে পুরনো শহরের দিকে হাঁটছিলাম আর মনে হচ্ছিল, শহরটা খুব শান্ত। বড় শহরের মতো হইচই নেই। পুরনো শহরে ঢুকেই ভালো লাগল। সরু পাথরের রাস্তা, রঙিন বাড়ি, ছোট দোকান আর ক্যাফে—সব মিলিয়ে একটা আরামদায়ক পরিবেশ। এই সব রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলে না, তাই ধীরে ধীরে হাঁটতে কোনো অসুবিধা নেই। আসলে পুরনো শহরের বিরাট একটি অংশে গাড়ি ঢোকা নিষেধ। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখি, রাস্তার মাঝখান থেকে একটা লোকের মাথা বের হয়ে আছে! পরে জানলাম, এটা "কুমিল" নামের বিখ্যাত ভাস্কর্য। সবাই দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে, আমরাও তুললাম। আমি ওর মাথা ছুঁতে যাচ্ছিলাম কিন্তু আশেপাশের অনেকেই "No No" করে উঠল। একজন বললো ওর মাথা ছুঁলে অমঙ্গল হবে। আমি যদিও কুসংস্কারে বিশ্বাস করি না কিন্তু সবাই বলাতে ছুলাম না। ছোট জিনিস, কিন্তু বেশ মজার।
ছবি ১৪- বিখ্যাত ভাস্কর্য "কুমিল" এর পাসে।
এরপর গেলাম সেন্ট মার্টিন ক্যাথেড্রালে। আগে এখানে হাঙ্গেরির রাজা বা রানীর সিংহাসনে আরোহণের আনুষ্ঠানিক উৎসব বা অনুষ্ঠান (coronation) হতো। ভেতরে ঢুকে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। জায়গাটা খুব শান্ত, একটা আলাদা অনুভূতি দেয়। তারপর হেঁটে হেঁটে মিখায়েলস গেটের (Michael's Gate) কাছে গেলাম। এটিই পুরনো শহরের একমাত্র পুরনো গেট যা এখনো আছে। চারপাশে দোকানপাট, মানুষ কফি খাচ্ছে, গল্প করছে। শহরটা ছোট, কিন্তু হাঁটতে ভালো লাগে—কোনো তাড়া নেই। এরপর আমরা ওখান থেকে ছোট ট্রলি বাসে করে ব্রাতিস্লাভা ক্যাসেল গেলাম এবং দুর্গের দিক থেকে ডানুব নদীর দিকে তাকালাম। নদী, পুরনো শহর আর আশেপাশের দৃশ্য একসাথে খুব সুন্দর লাগছিল।
ছবি ১৫- বামে ব্রাতিস্লাভা ক্যাসেল; ডানে ক্যাসেলের পাস থেকে শহরের ছবি।
সন্ধ্যার আগেই জাহাজে ফিরে এলাম। খেতে খেতে জানালা দিয়ে দেখি, জাহাজ চলছে আর ব্রাতিস্লাভা ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই আমরা এগিয়ে চললাম বুদাপেস্টের দিকে।
বুদাপেস্ট, হাঙ্গেরি, ১৬-১৭ মে, শুক্র ও শনিবার
এরপর এলো বুদাপেস্ট—এই ভ্রমণের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। বুদাপেস্ট অনেক বড় শহর, অনেক জায়গায় যাওয়া এবং অনেক কিছু দেখার আছে। সবকিছু বিবেচনা করে ক্রুজ কর্তৃপক্ষ এখানে দুইদিন থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
বুদাপেস্ট (Budapest) হাঙ্গেরির রাজধানী। শহরটি ডানুব নদী (Danube) দ্বারা দুইভাগে বিভক্ত: বুদা (পশ্চিম) এবং পেস্ট (পূর্ব), এবং জনসংখ্যা প্রায় ১.৭৫ মিলিয়ন। তারা হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় কথা বলে তবে পর্যটক এলাকায় ইংরেজিও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ১৮৭৩ সালের আগে বুদা ও পেস্ট দুইটি আলাদা শহর ছিল। ১৮৭৩ সালের দিকে শহরদুটি একত্রিত হয়ে বুদাপেস্ট নাম ধারণ করে এবং হাঙ্গেরির স্থায়ী রাজধানী হয়।
বুদাপেস্টের রেল ও বাস নেটওয়ার্ক খুব সমৃদ্ধ। যেদিকে তাকাই সেদিকেই ট্রেন বা বাস দেখা যায়। আর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এখানকার সব ধরণের পাবলিক ট্রানজিট বয়স্কদের (৫৫+) জন্য ফ্রি। একজন স্থানীয় যাত্রী বললো, গত বছর পর্যন্ত এটা শুধু হাঙ্গেরিয়ানদের জন্য ফ্রি ছিল। এ বছরের প্রথম থেকে বিদেশিদের জন্যও ফ্রি করেছে। আমি এমনিতেই পাবলিক ট্রানজিট পছন্দ করি। আর ফ্রি হওয়ায় প্রায় সারাদিন শহরের উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম সব লাইনেই ঘুরে বেড়িয়েছি। আমার সাথে ঘোরার সঙ্গী ছিলেন সদরুল ভাই। ডা. সদরুল্লা আমার চেয়ে ৭ বছরের বড় কিন্তু মনে হচ্ছিল আমার চেয়েও বেশি এনার্জেটিক।
বুদা ক্যাসেল এলাকায় উঠে পুরো শহর দেখলাম ওপর থেকে। ফিশারম্যান'স ব্যাস্টিয়ন থেকে নদী আর পেস্ট এলাকার দৃশ্য অসাধারণ। এরপর গেলাম সেন্ট স্টিফেনস ব্যাসিলিকায়—বিশাল গম্বুজ, শান্ত ভেতরের পরিবেশ।
ছবি ১৬- বিখ্যত বুদা ক্যসেল; রাতে ডানুব নদী থেকে তোলা ছবি।
একটা বিশেষ অভিজ্ঞতা ছিল নিউ ইয়র্ক ক্যাফে। বলা হয়, "পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ক্যাফে।" ক্যাফের কাছে পৌঁছানোর আগে অনেক দূর থেকে মনে হচ্ছিল লম্বা লাইন। আমার খুব ইচ্ছা ছিল ভিতরে গিয়ে এক কাপ কফি খাবো কিন্তু এত বড় লাইন দেখে আমার সাথের সবাই ভিতরে যেতে চাইলেন না। ফলে আমার আর কফি খাওয়া হলো না।
ছবি ১৭- নিউ ইয়র্ক ক্যাফে- পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ক্যাফে।
আমরা বুদাপেস্টে দুইদিন থাকি এবং একদিন ক্রুজ কর্তৃপক্ষ আমাদের বাস ট্যুরের ব্যবস্থা করে এবং বিভিন্ন নামকরা জায়গায় নিয়ে যায়। প্রথমে আমাদের নিয়ে যায় হিরোজ স্কোয়ারে (Heroes' Square), যেটা বুদাপেস্টের অন্যতম ঐতিহাসিক ও প্রতীকী স্থান। এই বিশাল চত্বরটি ১৮৯৬ সালে হাঙ্গেরির এক হাজার বছরের রাষ্ট্রীয় ইতিহাস উদ্যাপনের জন্য নির্মিত হয়। এখানে কেন্দ্রস্থলে মিলেনিয়াম স্মৃতিস্তম্ভ এবং হাঙ্গেরির সাতজন নেতার ভাস্কর্য রয়েছে, যাঁরা দেশ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। চারপাশে অবস্থিত মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস ও হল অব আর্টস এই স্থানটিকে সাংস্কৃতিকভাবেও সমৃদ্ধ করেছে। হিরোজ স্কোয়ার আজও হাঙ্গেরির গৌরব ও জাতীয় চেতনার প্রতীক। আমরা এলাকাটা ঘুরে দেখলাম এবং ছবি তুললাম।
ছবি ১৮- উপরে হিরোজ স্কয়ারে তোলা দুটি ছবি। নিচে সেন্ট স্টিফেন ব্যসিলিকা এবং মিলেনিয়াম মনুমেন্ট।
হাঙ্গেরিয়ান পার্লামেন্ট ভবন (Hungarian Parliament Building) আমাদের জাহাজ থেকে বেশি দূরে না। আমরা একটি বাসে করে গিয়েছিলাম এবং বেশ সময় কাটিয়েছিলাম। এটি ডানুব নদীর তীরে অবস্থিত। বিরাট এলাকা, সন্ধ্যার পর লাইটিং এত সুন্দর লাগছিল যেটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ১৮৮৫ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ১৯০৪ সালে সম্পন্ন হয়। স্থপতি ছিলেন ইমরে স্টেইন্ডল (Imre Steindl)।
ছবি ১৯- হাঙ্গেরিয়ান পার্লামেন্ট ভবনের এক পাস থেকে তোলা ছবি।
শেষের দিন সন্ধ্যার পর জাহাজ যখন শহরের মাঝখান দিয়ে চলছিল, তখন ডানুব নদীর দুই পাড়ে আলোয় ঝলমল পার্লামেন্ট ভবন, চেইন ব্রিজ আর বুদা ক্যাসেল দেখে সত্যিই চোখ ফেরানো যাচ্ছিল না। ইউরোপে এমন রাতের দৃশ্য খুব কম শহরেই আছে।
মোহাচ, বুদাপেস্ট – ১৮ মে, রবিবার
১৮ মে, রবিবার। আমাদের জাহাজ হাঙ্গেরির দুইটি শহরে থেমেছিল— বুদাপেস্ট এবং মোহাচ। আগের দিন বুদাপেস্ট ছেড়ে আমরা রাতভর ভেসে চলেছি। ভোরে ঘুম ভাঙতেই দেখি জাহাজ ধীরে ধীরে মোহাচের ঘাটে ভিড়ছে। জানালা খুলে বাইরে তাকিয়ে প্রথম যে অনুভূতিটা হয়েছিল—শান্তি। কোনো তাড়াহুড়া নেই, শব্দ নেই, শুধু নদীর নীরব স্রোত।
সকালে নাস্তা সেরে আমরা দল বেঁধে শহরের দিকে হাঁটতে বের হলাম। রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। কোথাও ভিড় নেই। দোকানের শাটার নামানো, ক্যাফের দরজা বন্ধ। প্রথমে একটু অবাক লাগলেও পরে বুঝলাম—রবিবার এখানে সত্যিই বিশ্রামের দিন। মনে হলো, মানুষ কাজের পেছনে ছোটে, কিন্তু ছুটির দিনটা পুরোপুরি নিজের জন্য রাখে।
মোহাচ ছোট শহর, কিন্তু বেশ গোছানো। বাড়িগুলো একতলা-দোতলা, সামনে ছোট বাগান। কোথাও ফুল ফুটে আছে। দূরে ডানুব নদী শান্তভাবে বইছে। বড় শহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে এমন নিরিবিলি সকাল আমার খুব ভালো লেগেছে। হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল—জীবন আসলে এমনই হওয়া উচিত, ধীরে চলা, নিজের ছন্দে। শহরের কেন্দ্রে গিয়ে আমরা ছবি তুললাম। আমি আর দারা ভাই একটি মূর্তির নিচে বসে ছবি তুললাম যেটাকে একজন স্থানীয় অধিবাসী বললে এটা এখানকার কার্নিভাল ফেস্টিভ্যালের প্রতীক। তারপর ধীরে ধীরে জাহাজে ফিরে এলাম। আসার সময় এখানকার স্থানীয় দোকানে গিয়ে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনেছিলাম।
ছবি ২০- কার্নিভাল ফেসটিভাল স্ট্যচু।
ভুকোভার, ক্রোয়েশিয়া – ১৯ মে, সোমবার
পরের দিন আমরা পৌঁছালাম ভুকোভার শহরে। বড় শহরের মতো ঝলমল নেই, উঁচু দালান নেই, কিন্তু শহরটা অদ্ভুতভাবে আপন মনে হলো। ডানুবের ধারে ছোট্ট, শান্ত শহর।
সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা মনে ধরেছে—এখানকার মানুষ। আমরা হাঁটছিলাম, আর অনেকে হাসিমুখে "হাই" বলে শুভেচ্ছা জানাচ্ছিল। একদম সহজ, স্বাভাবিক আচরণ। বিদেশের মাটিতে এমন আন্তরিকতা মন ছুঁয়ে যায়। আমি জানি না, তবে মনে হয় ক্রোয়েশিয়ার মানুষ এরকমই হয়।
শহর ঘুরতে ঘুরতে বুঝলাম—যুদ্ধের ইতিহাস এখানে গভীর। ১৯৯০–এর দশকের সংঘাতের দাগ এখনো কিছু ভবনে রয়ে গেছে। কিন্তু মানুষ জীবন থামিয়ে রাখেনি। নদীর ধারে কেউ হাঁটছে, কেউ কফি খাচ্ছে, কেউ আড্ডা দিচ্ছে। সবকিছু খুব সাধারণ, কিন্তু সেই সাধারণের মধ্যেই এক ধরনের দৃঢ়তা আছে।
এখানে 3D Street Art নামের একটি কাজ খুব সুন্দর লাগছিল। ওখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছিলাম।
ছবি ২১- 3-D পায়ে হাঁটা ছবি।
ভুকোভারের ওয়াটার টাওয়ার শহরের প্রতীক। যুদ্ধের সময় শত শত গোলার আঘাতেও ভেঙে পড়েনি। আজও গুলির দাগ রেখে দেওয়া হয়েছে—ইচ্ছাকৃতভাবে। উপরে উঠে পুরো শহর ও ডানুব দেখা যায় কিন্তু সময়ের অভাবে উঠা হয়নি।
নোভি সাদ, সার্বিয়া – ২০ মে, মঙ্গলবার
ভুকোভার থেকে আমরা যাই নোভি সাদ। শহরে ঢুকেই আলাদা একটা প্রাণশক্তি টের পাওয়া যায়। তরুণদের শহর বললে ভুল হবে না। রাস্তায় রাস্তায় ক্যাফে, খোলা আড্ডা, হাসি—সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ।
ছবি ২৩- ১৮৯২ সালে তৈরী চার্চ।
আমরা পুরনো শহর ঘুরে গেলাম বিখ্যাত পেট্রোভারাদিন দুর্গে (Petrovaradin Fortress)। দুর্গের ওপর দাঁড়িয়ে নিচে ডানুব নদী আর পুরো শহর দেখা যায়। দৃশ্যটা অসাধারণ। বাতাস বইছিল, আকাশ পরিষ্কার—মনে হচ্ছিল সময় একটু থেমে গেছে।
ছবি ২৪- পেট্রভারাডিন ফোর্ট, নেভি সাড, ডানুব নদী থেকে তোলা ছবি।
ভাবছিলাম, একসময় এই দুর্গ যুদ্ধের সাক্ষী ছিল। এখন সেখানে পর্যটক ছবি তুলছে, কেউ সংগীত বাজাচ্ছে, কেউ গল্প করছে। ইতিহাস আর বর্তমান পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
ছবি ২৫- নোভি সাদ নদীর ধারে বসে তোলা ছবি।
বেলগ্রেড, সার্বিয়া – ২১ মে, বুধবার
পরদিন পৌঁছালাম বেলগ্রেডে। আমাদের ডানুব ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড। এই শহরটা অন্যরকম, বেশ বড় এবং খুব ব্যস্ত। ডানুব আর সাভা নদীর মিলনস্থলে দাঁড়িয়ে আছে শহরটি। শহরটিতে পৌঁছে মনে হলো—ইতিহাস আর সংস্কৃতির এক মিলনমেলা।
ছবি ২৭- ডানুব আর লাভা নদীর মিলন স্হান। ফোর্টের ভিতর থেকে তোলা ছবি।
বেলগ্রেডের অনেক জায়গা ঘুরেছি, তবে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে কালেমেগদান দুর্গ (Kalemegdan Fortress)। এই দুর্গের এক পাশে নদীর দিকে দাঁড়িয়ে আমরা দেখেছি দুই নদীর মিলন, সেই দৃশ্য সত্যিই অসাধারণ। উপর থেকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়—দুই নদীর জলের রঙও আলাদা। ইতিহাসের কত যুদ্ধ, কত দখলদারিত্ব, কত সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের সাক্ষী এই স্থান—ভাবতেই গা শিউরে ওঠে।
ছবি ২৬- কালেমেগদান দুর্গের গেটের বাহিরে (বামের ছবি) গেটের ভিতরের ছবি (ডানের ছবি)।
আমরা আরও ঘুরে দেখেছি বিশালাকার চার্চ অব সেইন্ট সাভা (Church of Saint Sava)। সাদা গম্বুজ আর সুবিশাল স্থাপত্য দেখে বোঝা যায়, সার্বদের কাছে এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতীক। ভেতরের নকশা ও ম্যুরাল কাজ মন কাড়ার মতো। আমাদের গাইড বলছিল যে এটা বেলগ্রেডের সবচেয়ে বড় চার্চ। আমি ভিতরে গিয়ে চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম আর ছবি তুলছিলাম। হঠাৎ দেখি একজন নিরাপত্তা কর্মী আমার কাছে এসে কানে কানে বলছে, দয়া করে মাথার হ্যাটটা খুলুন। তখন আমার খেয়াল হলো আমি হ্যাট পরে আছি। আমি জানতাম চার্চে হ্যাট পরা নিষেধ কিন্তু খেয়াল ছিল না যে আমার মাথায় হ্যাট আছে। আমি সরি বলে হ্যাটটা খুলে হাতে নিলাম।
ছবি ২৮- চার্চ অব সেন্ট সাভা।
বেলগ্রেড শহরটি আমার কাছে একদিকে যেমন ঐতিহাসিক, তেমনি আধুনিকও মনে হয়েছে। পুরনো দুর্গ আর চার্চের পাশেই আধুনিক ক্যাফে সংস্কৃতি, তরুণদের প্রাণচাঞ্চল্য। ডানুব তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়েছে—এই শহর বহু ঝড়-ঝাপটা সামলেও নিজের স্বকীয়তা ধরে রেখেছে।
আমার এই বেলগ্রেড ভ্রমণ শুধু দর্শনীয় স্থান দেখা নয়; বরং ছিল ইতিহাসকে চোখের সামনে অনুভব করার এক গভীর অভিজ্ঞতা।
আমরা এখানে ট্রেনে ও বাসে অনেক ঘুরেছিলাম। আমাদের একজন স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে খেতে চাচ্ছিল তবে হালাল রেস্টুরেন্ট পেতে অনেক খোঁজ করতে হয়েছিল।
ছবি ২৯- বেলগ্রেডে হালাল ফুডের দোকানের সামনে।
ভিডিন, বুলগেরিয়া – ২২ মে, বৃহস্পতিবার
২২ মে ২০২৫ সকালে আমাদের জাহাজ ভিডিনে পৌঁছায়। এই শহরটি আমার কাছে খুব শান্ত ও ঐতিহাসিক মনে হয়েছে। শহরে তাড়াহুড়া নেই। মানুষ ধীরে হাঁটে, ছোট দোকানে বসে গল্প করে। রাস্তা দিয়ে হাঁটছি আর দেখছি দুপাশে অনেক বয়স্ক লোক বসে আছে। আমি কয়েকজনকে হাই বললাম কিন্তু কেউ উত্তর দিল না। পরে জানতে পারলাম এই দেশটি বিশেষ করে এই এলাকা বহুদিন কমিউনিস্ট শাসকের অধীনে থাকায় মানুষগুলো কথা বলতে ভয় পায়, বিশেষ করে বয়স্ক মানুষেরা। এই শহরের ওপর পড়াশোনা করে জানলাম, এখানকার লোকসংখ্যা গত কয়েক বছরে অর্ধেকের চেয়ে কমে গেছে। অর্থনীতি খুব খারাপ, কোনো চাকরি নেই। তাই ইয়ং জেনারেশন এই দেশটা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আওতায় আসার পর অন্য দেশে চলে গেছে। শুধু বয়স্ক লোকেরা আছে। এখানে বয়স্ক লোকেরা ফ্রি বাসস্থান পায় এবং মাসে সামান্য বয়স্ক ভাতা পায় যা দিয়ে কোনোমতে চলে যায়।
তবে আমরা দুটো জায়গায় গিয়ে খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম। একটা হলো ওসমান পাজভানতোওলু মসজিদ (Osman Pazvantoğlu Mosque) এবং পাশের লাইব্রেরি দেখে। জায়গাটি এখনো স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। আমাদের সফরের সময় দুইজন কেয়ারটেকারের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, এখানে নিয়মিত জুমার নামাজ আদায় করা হয় এবং প্রতিদিনও কয়েকজন মুসল্লি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে আসেন।
ছবি ৩০- ভিডিনে ওসমান পাজভানতোওলু মসজিদ।
শহরটির দীর্ঘ ইসলামী ইতিহাস রয়েছে। ১৩৯৬ সালে অটোমানরা ভিডিন দখল করে এবং ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত শাসন করে। সেই সময়ে ভিডিন ডানুব তীরবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সামরিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। অটোমানরা এখানে একাধিক মসজিদ, ব্যারাক ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করে।
বি ৩১- বামে আমরা মসজিদে নামাজ পড়ার পর; ডানে মসজিদ লাইব্রেরীতে।
ওসমান পাজভানতোওলু ছিলেন ভিডিনের অটোমান গভর্নর। তাঁর উদ্যোগেই ১৮০১–১৮০৩ সালের মধ্যে এই মসজিদ নির্মিত হয়—১৮০১–১৮০২ সালে মসজিদ এবং ১৮০২–১৮০৩ সালে লাইব্রেরি সম্পন্ন হয়। তিনি এটি তাঁর পিতার স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন।
মসজিদটি পাথরের তৈরি, আকারে ছোট কিন্তু স্থাপত্যে অনন্য। ভেতরে নারীদের জন্য আলাদা গ্যালারি রয়েছে এবং কাঠের নকশাকাজ অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দৃষ্টিনন্দন। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—মিনারের চূড়ায় সাধারণ অর্ধচন্দ্রের পরিবর্তে একটি হৃদয়াকৃতির প্রতীক রয়েছে, যা একে অনন্য বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। গভর্নর এখানে একটি মাদ্রাসাসহ ধর্মীয় কমপ্লেক্সও নির্মাণ করেছিলেন, তবে তা এখন আর অবশিষ্ট নেই।
ভিডিন ভ্রমণে আমরা আরও দেখেছি বাবা ভিডা দুর্গ (Baba Vida Fortress)—ডানুব তীরের ঐতিহাসিক দুর্গ, যা মধ্যযুগীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। দুর্গের প্রাচীরের এক পাশে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকালে মনে হচ্ছিল আমি যেন আগেকার দিনে ফিরে গেছি।
ছবি ৩২- বাবা ভিডা দুর্গ এবং এর সামনে।
সব মিলিয়ে ভিডিন আমাদের কাছে শুধু একটি ছোট শহর নয়—এটি ছিল ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্মৃতির এক জীবন্ত অধ্যায়।
বুখারেস্ট, রোমানিয়া – ২৩-২৪ মে, শুক্র ও শনিবার
ডানুব নদী বুখারেস্ট শহর থেকে প্রায় চল্লিশ মাইল দক্ষিণ দিয়ে বয়ে গেছে। ফলে আমাদের ফাইনাল ডেস্টিনেশন বুখারেস্ট হলেও আমাদের জাহাজ নোঙর করেছিল জুর্জু (Giurgiu) নামের এক জায়গায় যেখান থেকে বুখারেস্ট আসতে প্রায় এক ঘন্টা সময় লেগেছিল।
বুখারেস্ট শহর আমাদের ট্যুর প্যাকেজে ছিল না। তবে ক্রুজ কোম্পানি আমাদের একটি বাসে করে বুখারেস্টে পৌঁছাতে দিয়েছিল। আমরা সবাই বুখারেস্টে একটি হোটেলে দুই দিন ছিলাম এবং নিজের মতো করে ঘুরেছিলাম। এখানে আমরা একদিনের জন্য একটি ২০ সিটের বাস রেন্ট করেছিলাম যেখানে ড্রাইভার ও একজন গাইড ছিল। বাস বিভিন্ন ট্যুরিস্ট প্লেসে গিয়ে থামতো আর গাইড বর্ণনা করতো। তারপর আমরা বাস থেকে নেমে ঐ জায়গায় ঘুরে ঘুরে দেখতাম।
ছবি ৩৩- বুখারেস্টে বাসের ভিতরে।
বুখারেস্টকে বলা হয় "লিটল প্যারিস"। ইউরোপের বহু শহর ঘোরার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বুখারেস্ট ঘুরে আমি নিজেও বুঝতে পেরেছি কেন এই নামটি এসেছে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে রোমানিয়ার উচ্চবিত্ত সমাজ ফরাসি সংস্কৃতির প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট ছিল। শিক্ষিত মানুষরা ফরাসি ভাষায় কথা বলতেন, অনেকেই পড়াশোনা করতে যেতেন প্যারিসে, আর শহরের নকশা ও স্থাপত্যে আনা হয় ফরাসি প্রভাব। তাই বুখারেস্টের কিছু অংশে হাঁটলে মনে হয় যেন প্যারিসের কোনো রাস্তা দিয়ে হাঁটছি।
ছবি ৩৪- বামে-রেভলুসন স্কয়ার বুখারেস্ট। ডানে- ন্যাসনাম মিউজিয়াম অব আর্ট।
শহরের কেন্দ্রীয় অংশে, বিশেষ করে চওড়া রাস্তা আর পুরোনো ভবনগুলোর দিকে তাকালে চোখে পড়ে নকশাদার বারান্দা, অলংকৃত দেয়াল, গম্বুজ আর ক্লাসিক ইউরোপীয় সৌন্দর্য। রোমানিয়ান অ্যাথেনিয়ামের (Romanian Athenaeum) সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছিল, এটি যেন প্যারিসের কোনো সাংস্কৃতিক স্থাপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
আরও একটি প্রতীকী স্থাপনা হলো আর্কুল দে ত্রিয়ম্ফ (Arcul de Triumf), যা প্যারিসের আর্ক দ্য ত্রিয়োঁফ থেকে অনুপ্রাণিত। এটি স্পষ্টভাবে দেখায়, শহরটি একসময় নিজেকে প্যারিসের আদলে গড়ে তুলতে চেয়েছিল। আমাদের বাস আর্কুল দে ত্রিয়ম্ফ এর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছিল প্যারিসের আর্ক দ্য ত্রিয়োঁফ এর পাশ দিয়ে যাচ্ছি।
ছবি ৩৫- আর্কুল দে ট্রিয়াম্প।
সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছি বিশাল প্যালেস অব দ্য পার্লামেন্ট (Palace of the Parliament) দেখে। এত বড় প্রশাসনিক ভবন—চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। এই প্যালেস তৈরি করেছিল তখনকার কমিউনিস্ট ডিক্টেটর নিকোলাই চসেস্কু (Nicolae Ceaușescu)। নিকোলাই চসেস্কু এবং তাঁর স্ত্রীকে ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বর ২৫ তারিখে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। নিকোলাই চসেস্কুর বাড়িটিকে এখন মিউজিয়াম করা হয়েছে। আমরা সেখানে গিয়ে দেখেছি এবং ইতিহাস জেনেছি।
ছবি ৩৬- রোমানিয়ার পার্লামেন্ট ভবন।
এরপর আমরা একটি অন্যধরনের মিউজিয়ামে গিয়েছিলাম, ভিলেজ মিউজিয়াম (Dimitrie Gusti National Village Museum)। আসলে মিউজিয়াম বললে ভুল হবে। এটাকে একটি পুরনো দিনের শহর বলা যায়। এখানে বুখারেস্টের বিভিন্ন এলাকার পুরনো দিনের বাড়িঘর কেমন ছিল সেটাকে তৈরি করে ঘর, বাড়ি এবং উঠান তৈরি করে রাখা হয়েছে। এখানে ঘুরে বাংলাদেশের পুরনো দিনের গ্রামের বাড়ির মতো লাগছিল। এখানে আমরা অনেক সময় কাটিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখেছিলাম।
ছবি ৩৭- ভিলেজ মিউজিয়ামে তোলা ছবি।
শহরের একদিকে পুরনো ইউরোপীয় স্থাপত্য, অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক আমলের ভারী, বিশাল দালান। দুটো যুগ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। পুরনো শহর এলাকায় হাঁটতে হাঁটতে ক্যাফেতে বসেছি, কফি খেয়েছি, মানুষ দেখেছি। এখানে অনেক বাংলাদেশি অল্প বয়সের মানুষ থাকে। আমরা একটি মলে ঢুকছি এমন সময় দেখি একটি ছেলে খাবার ডেলিভারির বাইকে হেলান দিয়ে ফোনে বাংলায় কথা বলছে। আমরা ওর দিকে গিয়ে কথা বললাম এবং জানতে পারলাম অনেক বাংলাদেশি এখানে এসেছে এবং বেশির ভাগই অ্যাপের মাধ্যমে খাবার ডেলিভারির কাজ ও রেস্টুরেন্টে কাজ করে। কিছুদিন পরে এক বাংলাদেশি ভদ্রলোক আমাকে বললো যে রোমানিয়ায় অনেক বাংলাদেশিকে কাজের পারমিট দিয়ে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে এসেছে এবং এই প্রথম রোমানিয়া বাইরে থেকে লিগ্যাল ওয়েতে লোক এনেছে। ভদ্রলোক লন্ডন থাকেন। তিনি আরও বললেন যে এখানকার কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশিদের উপর সন্তুষ্ট না কারণ অনেক বাংলাদেশি এখানে এসে পরে পশ্চিম ইউরোপের অনেক দেশে চলে যায় যা কর্তৃপক্ষ পছন্দ করছে না।
এখানেই আমাদের এই ভ্রমণের শেষ। মনে হচ্ছিল—ডানুবের সঙ্গে কয়েকটা দিন কাটিয়ে যেন ইউরোপকে একটু অন্যভাবে দেখলাম। বড় শহর, ছোট শহর, যুদ্ধের ইতিহাস, মানুষের হাসি—সব মিলিয়ে এই ভ্রমণ মনে থাকবে দীর্ঘদিন।
এই রিভার ক্রুজের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল—প্রতিদিন নতুন শহর, নতুন দেশ, কিন্তু ঘর একই। বারবার প্যাকিং করতে হয়নি। জাহাজই ছিল আমাদের ভাসমান হোটেল, আর ডানুব নদী ছিল সারাক্ষণের সঙ্গী।
নদীর দুই পাড়ে বদলে যাওয়া শহর, মানুষ আর জীবনযাপন দেখে বুঝেছি—ভ্রমণ মানে শুধু ছবি তোলা নয়। ভ্রমণ মানে ধীরে ধীরে দেখা, বোঝা, আর নিজের ভেতরেও একটু বদলে যাওয়া।
ডানুব নদীর মতোই এই যাত্রা আমাদের মনে রেখে গেছে দীর্ঘ স্মৃতি আর শান্ত এক অনুভূতি।